বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনপ্রাপ্তির চিত্র যেন এক প্রকার দুঃখজনক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। মাসের অর্ধেক বা শেষে বেতন পাওয়া যেন এখানে এক স্বাভাবিক ঘটনায় রূপ নিয়েছে, যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই শিক্ষকদের বেতন মাসের শুরুতেই দেওয়া হয়—সম্মানের সাথে, সময়মতো। আমাদের দেশের শিক্ষকরা, যারা জাতি গঠনের কারিগর, তারা নিয়মিতভাবেই নিজেদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শুধু সময়মতো বেতন না পেয়ে।
বলা হয়েছিল, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে এই সমস্যা চিরতরে সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তির এই অগ্রগতিও ব্যর্থ হয়েছে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও গাফিলতির কাছে। মাউশির (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কারণে এই সংকট এখনো বহাল। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ফাইল আটকে রাখেন, জিও প্রকাশে বিলম্ব করেন, আর একেকটি সময়জ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের বলি হন দেশের চার লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী।
যদি এটি সাময়িক সমস্যা হতো, তাহলে তা মেনে নেওয়া সহজ হত। কিন্তু এটি এখন নিয়মিত একটি ঘটনা—যা একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। প্রায় প্রতি মাসেই দেখা যায়, শিক্ষকদের বেতন নিয়ে মিডিয়ায় লেখালেখি ও প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই জিও জারি হয়, তারপর শুরু হয় বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া। এই বিষয়টি এখন এমন একটা জায়গায় পৌছেছে যে, এটা নিয়ে কথা বলতে আমি একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসাবে আমার নিজেরই লজ্জা লাগে। একই দেশে চাকুরী করে অন্যান্য পেশার কর্মরতা ব্যাক্তিবর্গরা যেখানে প্রতিমাসে নিয়মিত সঠিকভাবে সঠিক সময়ে তাদের বেতনের টাকা বুঝে পাচ্ছে। তাহলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা কেন নিয়মিত ভাবে এই বৈষম্যের শিকার হবে।
এই পরিস্থিতি শুধু আর্থিক দুরবস্থার সৃষ্টি করে না, এটি শিক্ষক পেশার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক করুণ দলিল। একজন শিক্ষক যখন মাসের মাঝামাঝি বা শেষে বেতন পান, তখন তাঁর পরিবার চলে ধার-দেনায়, শিক্ষায় মনোযোগের জায়গায় আসে হতাশা ও অস্থিরতা। এই অবস্থা প্রকারান্তরে শিক্ষার গুণগত মানেও প্রভাব ফেলে।
শিক্ষকদের সময়মতো বেতনপ্রাপ্তি কেবল একটি প্রশাসনিক বা আর্থিক বিষয় নয়—এটি একটি নৈতিক এবং রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ব। এমন অব্যবস্থাপনার দায় কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাউশির নয়; এটি পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার, একটি জাতির লজ্জা। প্রয়োজন এখনই একটি পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক বেতন ব্যবস্থাপনার, যেখানে সময়মতো শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন নিশ্চিত করা হবে প্রযুক্তি, মানবিকতা ও নীতিনৈতিকতার সমন্বয়ে।
পরিশেষে, শিক্ষকদের বেতন নিয়ে সংবাদ না করে তাদের সময়মতো প্রাপ্য পৌঁছে দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। না হলে “শিক্ষক সম্মান” কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে নয়।
যে সরকারেই আসুক শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করা লাগবে না।