একটি জাতির অগ্রগতি নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর। আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ হচ্ছেন শিক্ষক। তবে বাস্তবতা বলছে, আমাদের দেশে শিক্ষকদের মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। সময় এসেছে শিক্ষার মৌলিক কাঠামো, শিক্ষক সমাজ এবং তাদের কর্মপরিবেশের আমূল সংস্কারের।
পাশাপাশি আর একটি বিষয় এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমরা নিজেরা কতটুকু পরিবর্তন হতে চাই। আপনি যদি নিজেকে পরিবর্তন করতে না পারেন তাহলে এই অগ্রগামী পৃথিবীতে নিজেকে যুগোপোযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন না। নিজেও এই প্রতিযোগিতার যুগে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। তাই সেক্ষেত্রে আপনার নিজের উচিত প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে তোলার আগ্রহ। সেইক্ষেত্রে আপনার নিজের মধ্যে সংস্কার প্রবণতার গুণ থাকা সবার আগে প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু আমরা যারা শিক্ষকতা পেশায় আছি আমরা নিজেকে অধিক জ্ঞানী ভাবার কারণে নিজের দোষ ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে অক্ষম। নিজেকে কখনও আমরা ভাঙ্গতে চাই না। আপনি যদি নিজেক ভাঙ্গতে না পারেন তাহলে কখনই নতুনের স্বাদ পাবেন না।
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ করানোর মাধ্যমে নয়, বরং চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে গঠনমূলক পাঠদান দরকার। পুরাতন পাঠ্যক্রম আঁকড়ে ধরে নতুন পৃথিবীর প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা মুশকিল। বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলাতে হলে শিক্ষাকে যুগোপোযোগী করা একান্ত জরুরী। শিক্ষাকে বর্তমান যুগোপোযোগী করতে হলে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা, শিক্ষার পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা এবং বাস্তবমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি এই বিষয়টা ভাবতে হবে বা ভাবা জরুরি যে, এমন কোন পাঠ্যক্রম বাহির দেশ হতে অনুকরণ করা যাবে না যা আমাদের দেশের সাংস্কৃতির সাথে মানানসই নয়। মনে রাখতে বাংলাদেশ বাংলাদেশই এদেশের মানুষের একটা নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ ইউরোপ বা আমেরিকার কোন দেশ নয়,
শিক্ষক শুধু পেশাদার নন, তিনি জাতি গড়ার কারিগর। অথচ সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক পেশাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয় না। তরুণ মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। কারণ, সেখানে আর্থিক নিরাপত্তা নেই, সামাজিক স্বীকৃতি কম, এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ সীমিত। এই চিত্র বদলাতে হবে।
নতুন কারখানাতে যেমন পরাতন মেশিনে কিন্তু যুৎসই বা টেকসই প্রোডাক্ট পাবেন না। ঠিক তেমনি নতুন মেশিন চালাতে হলে প্রয়োজন নতুন দক্ষ
শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত বেতন, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশনসহ আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। শহর ও গ্রাম—দুই জায়গার শিক্ষকদের মধ্যে সুবিধার যে বৈষম্য তা দূর করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের এখন দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, শিক্ষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনা এই সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে।
শুধু সরকার নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরকে এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষকদের সম্মানিত করতে। অভিভাবকরা যদি শিক্ষকদের সহযোগী হিসেবে দেখেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ আরও শক্ত ভিত পাবে। আপনি যদি অভিভাবক হন তাহলে আপনার দায়িত্ব কিন্তু শুধু আপনার সন্তানের প্রতি সীমাবদ্ধ থাকবে বিষয়টি আজকের যুগে এমনটি ভাবার কোন কারণ নাই।
পরিশেষে যে কথাটি বলা প্রয়োজন তা হলো অনেক পুরাতন কথা নতুনভাবে মনে করানো দরকার তা হলো আমরা সকলে জানি বা বিশ্বাস করি যে, শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি। আর সেই ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষার ও শিক্ষকের উন্নয়ন। শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেওয়া গেলে আগামী প্রজন্ম পাবে একটি বলিষ্ঠ ও আলোকিত ভবিষ্যৎ। তাই এখনই সময়— শিক্ষাকে, শিক্ষককে এবং শিক্ষকের সুযোগ-সুবিধার সংস্কার করার।
Leave a Reply