বাংলা প্রবাদে বলা হয়—“সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?” এই কথাটা যেন হুবহু মিলে যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বছরের পর বছর ধরে চলা আচরণের সঙ্গে। প্রতিমাসেই একই আচরণ, প্রতিমাসেই বেতন প্রদানে নানা বাহানা, নানা অজুহাত। শিক্ষকরা কোন দাবি উঠালেই প্রথমে অজুহাত, পরে আন্দোলন-সংগ্রামের চাপে বাধ্য হয় কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণে—এটাই যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে।
প্রায় প্রতিটি মাসেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বেতন পেতে হিমশিম খান। মাস শুরু হলে শুরু হয় অপেক্ষা, এরপর শুরু হয় গড়িমসি—মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন হয়নি, সিজিএর ছাড়পত্র আসেনি, আইবাস++ এ ফাইল ঢোকেনি ইত্যাদি একগুচ্ছ “প্রক্রিয়াগত” অজুহাত, কখনও এই কর্মকর্তা ছুটিতে, কখনও এই কর্মকর্তা অসুস্থ ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতি মাসেই একই কিছুটা একই প্যাটার্ন এর সমস্যা আবির্ভুত হয়। এভাবে যখন মাসের মাঝামাঝি বা অর্ধেকের বেশি শেষ হয়ে যায় তখন মিডিয়ায় এই সকল বিষয় নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়, আন্দোলনের হুমকি কিংবা ঘেরাও কর্মসূচির মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখনই দেখা যায় সব কার্যক্রম হঠাৎ জোরদার হয়ে যায়, তখন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগিও এক দিনের ব্যবধানে বাসায় থেকে কাজ কর্ম শুরু করে দেয়। তখন অল্প সময়েই বেতন ছাড় করার সকল কার্যক্রম সম্পুর্ণ করা হয়। এই যেমন এ মাসেই এপ্রিলের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে মাউশি যে আচরণ করল এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের সাথে। প্রথমে বলল টেকনিক্যাল সমস্যা তারপর বলল যে, সিনিয়র সিষ্টেম এনালিষ্ট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে আছেন তাই বেতন প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। চেষ্টা করা হবে এপ্রিলের বেতন ঈদের পূর্বে দেওয়ার মে মাসের বেতন কোন ভাবেই ঈদের পূর্বে দেওয়া সম্ভব নয়। এখন যখন মিডিয়ায় এ বিষয় নিয়ে সোচ্চার ও শিক্ষকদের বিভিন্ন গ্রুপ এ বিষয় নিয়ে মাউশি ঘেরাও কর্মসুচী দিয়েছে তখন মাউশি ডিজি তড়িঘরি করে আজ ঘোষনা করছে যে, ঈদের পূর্বেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের মে মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা অবশ্যই প্রদান করা হবে। তাহলে আগে কেন বলা হয়েছিল সম্ভব নয়। একদিনের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্ত অসুস্থ শয্যাশায়ী রোগী কিভাবে এতটা সুস্থ হয়ে গেল যে, কয়েক দিন ও নয় কয়েক ঘন্টার মধ্যে সকল সমস্যা প্রায় সমাধান করে ফেলল। তাহলে কি দরকার ছিল এ নাটকের, কি দরকার ছিল এভাবে লোক হাসানোর।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—যখন চাপে পড়ে সব কাজ কয়েকদিনেই সম্পন্ন করা যায়, তখন শুরু থেকেই কেন এমন উদ্যোগ নেওয়া হয় না? কেন শিক্ষক সমাজকে অহেতুক মানসিক চাপ, সামাজিক ভাবে বিব্রত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখা হয়?
বছরের পর বছর ধরে জাতীয়করণ, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, টাইম স্কেলসহ নানা ন্যায্য দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলন করে আসছেন। প্রতিবারই প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয়, “এটা এখন সম্ভব না”, “বাজেট নেই”, “নীতিগত সমস্যা আছে”। অথচ পরবর্তীতে জনচাপ, গণমাধ্যমে কাভারেজ, কিংবা মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপে সেই দাবি এক সময় মেনে নেওয়া হয়।
অর্থাৎ, দাবি আদায়যোগ্য ছিলই। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রথমেই তা অস্বীকার করে শিক্ষক সমাজকে অপমান ও হয়রানির শিকার করার প্রয়োজন ছিল কি?
বর্তমানে অধিকাংশ সরকারি কার্যক্রম যখন ডিজিটাল এবং স্বয়ংক্রিয়, সেখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদানে প্রতিমাসে বিলম্ব প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে। ইএফটি পদ্ধতি চালুর উদ্দেশ্যই ছিল জটিলতা হ্রাস, স্বচ্ছতা এবং সময়ানুগতা নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবে জটিলতা বরং বেড়েছে।
এই পরিস্থিতি মাউশির দক্ষতা, দায়বদ্ধতা ও সদিচ্ছা—সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। সাধারণ মানুষ যখন শিক্ষক সমাজের অবস্থা জানতে পারে, তখন তারা কেবল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নয়, পুরো সরকারের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্ন করে।
সবশেষে ফিরে আসি প্রবাদটিতে—“সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?”
যদি জানা যায় শেষমেশ কাজটা হতেই হবে, করতেই হবে, তবে শুরুতেই সেটা সম্মানের সঙ্গে করা যেত না? কেন শিক্ষক সমাজকে রাস্তায় নামিয়ে দাবি আদায় করতে বাধ্য করা হয়? কেন আন্দোলন ছাড়া রাষ্ট্র শিক্ষককে ‘দেখে না’, ‘শোনে না’?
শিক্ষা ব্যবস্থার ৯৭ ভাগ যখন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল, তখন তাদের দাবি-দাওয়ায় অবহেলা মানে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা।
আমরা চাই, শিক্ষক সমাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বাস্তব প্রতিফলন—নথ খসানোর আগে আর লোক হাসানোর সুযোগ যেন আর তৈরি না হয়।
Leave a Reply