বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় অসঙ্গতির নাম—বদলি না থাকা। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বছরের পর বছর এক জায়গায় থেকে কাজ করছেন, অনেক সময় দুর্ভোগ নিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চালু রয়েছে। এবার সরকার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) উদ্যোগ নিয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্যও বদলি প্রথা চালু করার। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে নানা ধরনের জটিলতা এবং মতবিরোধ।
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা broadly দুই ভাগে বিভক্ত।
এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশ চান, বদলি যেন শুধু তাঁদের জন্যই প্রযোজ্য হয়। তাঁদের যুক্তি—যেহেতু তাঁরা একটি কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন, তাই কেন্দ্রীয় বদলি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়াও তাঁদের অধিকার। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তরা বলছেন—এটা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হবে, বদলি হলে সেটা হওয়া উচিত সকলের জন্য। কারণ, একই এমপিও কাঠামোর অধীনে কাজ করা দুই শিক্ষক ভিন্ন সুবিধা পেলে সেখানে বিভাজন তৈরি হবে। বিভাজিত সুবিধা মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আসলে কোন উন্নতি হবে না যা হবে তা হলো নতুন আর এক বৈষম্য। এর ফলে তৈরী হবে আর এক মত আর এক দল যা হবে আরও আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত।
বদলি কার্যকর করতে হলে সেটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও কর্তৃপক্ষ-নিয়ন্ত্রিত। যদি এটি শুধু সমঝোতার ভিত্তিতে হয়—’তুমি যাও, আমি আসি’ ধরনের অদৃশ্য লেনদেনে হয়—তাহলে বদলির আসল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। এতে শিক্ষকস্বার্থ হয়তো রক্ষা পাবে, কোন কোন ক্ষেত্রে তবে শিক্ষার স্বার্থ ও কিন্তু শিক্ষার মান বাড়বে না। কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে না। যে বদলি দিয়ে শুধু ব্যাক্তির স্বার্থ রক্ষা হবে সে বদলি কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখা দরকার। আমি বদলি প্রথার বিরুদ্ধে নই, তবে আমি সেই বদলি চাই যে বদলি দিয়ে শিক্ষার গুনগত মান নিয়ন্ত্রণ হবে। যে বদলি দিয়ে শিক্ষার সঠিক পরিবেশ গড়ে উঠবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় যেমন বদলি একটি শক্ত কাঠামোর মাধ্যমে হয়, যেখানে শিক্ষককে প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানান্তর করা হয়—ঠিক তেমন কাঠামো মাধ্যমিক পর্যায়েও গড়ে তুলতে হবে। যেখানে শিক্ষা ও শিক্ষক উভয়েরই স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। আচ্ছা একটা বিষয় ভেবে বলুনতো আমাদের মুল উদ্দেশ্য কি শিক্ষার উন্নয়ন তাইতো? শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি করা।
১. একটি কেন্দ্রীয় বদলি নীতিমালা তৈরি করা, যেখানে স্পষ্টভাবে বদলির যোগ্যতা, শর্ত ও প্রক্রিয়া উল্লেখ থাকবে।
২. বদলির ডাটাবেইসভিত্তিক একটি সফটওয়্যার পোর্টাল চালু করা, যেখানে শিক্ষক নিজেই আবেদন করবেন এবং প্রয়োজনীয়তাভিত্তিক অটোমেটেড বদলি সম্পন্ন হবে।
৩. এনটিআরসিএ ও মাউশির যৌথ উদ্যোগে বদলির দায়িত্ব নির্ধারণ করা।
৪. বদলির ক্ষেত্রে কোনও আর্থিক লেনদেন বা প্রভাব খাটানো হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫. সকল শিক্ষককে বদলির আওতায় আনতে হবে তাতে করে শিক্ষার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রথা চালু একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে—যদি তা সবার জন্য, স্বচ্ছ ও কর্তৃপক্ষনির্ভর হয়। পক্ষপাতদুষ্ট, সমঝোতাভিত্তিক কিংবা আংশিক বদলি প্রক্রিয়া এই উদ্যোগকে বিতর্কিত করে তুলবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে না। তাই সময় এসেছে বদলি নিয়ে রাজনীতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও ন্যায্য বাস্তবায়ন। শিক্ষার সঠিক মান ও সঠিক পরিবেশ তৈরিতে বদলির বিকল্প নাই।
Leave a Reply