এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মচারীদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এদেশে ষড়যন্ত্র ও টালবাহানা যেন এক দীর্ঘ ইতিহাস। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি কখনো প্রকাশ্যে, কখনো আড়ালে নানা কৌশলে তাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে। এখনও সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রয়েছে। আর আগামী দিনে এটি কেমন আকার ধারণ করবে, তা নির্ভর করছে আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের বিবেকশূন্য নীতি ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক সমাবেশে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মচারীর উপস্থিতি প্রমাণ করে, তারা আর পেছনে ফিরতে রাজি নয়। এই বিশাল সমাবেশে জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতাদের সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উভয়পক্ষই দ্রুততম সময়ে জাতীয়করণ বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হন। শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাতীয়করণের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দিতে বলা হয় এবং জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে, ২০ সেপ্টেম্বরেই, সেই হিসাব মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।
কিন্তু সমস্যার শুরু হয় এরপর। যত দ্রুত জোট চেষ্টা করছে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে, তত ধীরগতি এবং প্রায় ইচ্ছাকৃত টালবাহানা করছে শিক্ষা প্রশাসনের কিছু মহল। বিশেষ করে শিক্ষা সচিবের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) নামক এক প্রভাবশালী আমলা নানাভাবে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করছেন। ফলে জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের দায়িত্ব শেষ হলেও, শিক্ষা প্রশাসন তাদের ওপর অর্পিত কাজ সম্পন্ন করছে না।
এখন পর্যন্ত দুটি অধিদপ্তর (মাউশি ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর) হিসাব মন্ত্রণালয়ে ব্যয়ের প্রস্তাব পাঠালেও সেটি সম্ভব হয়েছে মূলত জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের চাপের কারণে। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে চিঠি না দেওয়ায় মাদ্রাসা অধিদপ্তর তাদের হিসাব পাঠাতে পারেনি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াই অযথা বিলম্বিত হচ্ছে। যদি আগামীকাল মাদ্রাসা অধিদপ্তরে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়, তবে হয়তো সোমবারের মধ্যেই তাদের হিসাবও মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতে পারে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়ে ডিও লেটার পাঠানো হবে এবং তারপরই চূড়ান্ত অনুমোদন মিলবে।
কিন্তু এখানেই মূল ফাঁদ। মাউশি ইতোমধ্যে প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকার বাৎসরিক হিসাব দিয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা অধিদপ্তরের যোগফল মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার মতো। শিক্ষা প্রশাসন এখানেই সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার অজুহাত দাঁড় করাবে। অথচ এই দেশেই বিশ্বব্যাংকের ১,৫০০ কোটি টাকার ঋণ থেকে ১৫০ কোটি টাকা কেবলমাত্র আমলাদের বিদেশ ভ্রমণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। সেই প্রস্তাবও কিন্তু পাঠায় আমলারা নিজেরাই। সুতরাং শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের মুখে “অর্থ সংকট” শোনাটা নিছক ভণ্ডামি ছাড়া কিছুই নয়।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা প্রশাসনের কিছু কুচক্রী আমলা ও অবসরপ্রাপ্ত স্বার্থান্বেষী সংগঠকরা কখনোই সহজে জাতীয়করণের দাবিকে বাস্তবায়ন করতে দেবে না। তাই জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটকে যেমন কূটনৈতিকভাবে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, তেমনি দেশের প্রতিটি শিক্ষক–কর্মচারীকেও আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে যেকোনো মুহূর্তে মাঠে নেমে আন্দোলন করার জন্য—অধিকারের প্রশ্নে, করুণার জন্য নয়।
প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, আজকের এই সংগ্রাম কেবল বেতন–ভাতার প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান রক্ষার প্রশ্ন। তাই আগামী দিনগুলোতে আমাদের আরও দৃঢ়সংকল্প ও সংগঠিত হতে হবে।
Leave a Reply