পৃথিবীতে শিক্ষা ও শিক্ষকদের প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টান্ত সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা যায় বাংলাদেশে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মুখেও শিক্ষকদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য শোনা যায় নিয়মিত, অথচ এতে কারও বিবেকে বিন্দুমাত্র বাধে না। শিক্ষার সঙ্গে যাঁরা সংশ্লিষ্ট, তাঁরাই শিক্ষক সমাজকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতে তাঁরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত হন না। দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, যোগাযোগসহ অসংখ্য খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হলেও শিক্ষার সংস্কারকে খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনো খাতের উন্নয়ন স্থায়ী বা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। সমস্যা হলো, শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না; দীর্ঘ সময় পর এর সুফল ধরা দেয়। যাঁদের দৃষ্টিশক্তি কেবল আজকের লাভ-ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ, তাঁদের কাছে শিক্ষায় বিনিয়োগ সবসময়ই ব্যয় মাত্র, কোনো উৎপাদনশীল খাত নয়। ফলে সরকার, আমলাতন্ত্র ও পেশাজীবী মহলের বড় অংশের কাছে শিক্ষায় বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে মাথাব্যথা থেকে যায়।
যদি আমরা বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে সহজেই বুঝতে পারব যে কোনো জাতি ও দেশের উন্নয়ন শিক্ষার উপর সরাসরি নির্ভরশীল। জাপানের উদাহরণটি বিশ্বজুড়ে শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত। বলা হয়ে থাকে, জাপানের একটি প্রত্যন্ত রেলস্টেশন বহু বছর শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থীর জন্য খোলা রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন সেই শিক্ষার্থী সেই স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেত এবং পড়াশোনা শেষে ফেরত আসত। একক শিক্ষার্থীর প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে এত ব্যয়বহুল অবকাঠামো সচল রাখার দৃষ্টান্ত কেবল শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখার মানসিকতার ফসল। শিক্ষার্থীটির গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন হওয়ার পরেই সেই স্টেশনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখানে শিক্ষা বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং জাতি গঠনের স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে দেখার যে মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, সেটিই জাপানকে আজকের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাপানে একজন শিক্ষার্থীর জন্য কোটি টাকার রেলস্টেশন সচল রাখা হয়, অথচ বাংলাদেশে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ৯৭ শতাংশ পরিচালনা করা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সরকার চরম উদাসীন। এই শিক্ষক সমাজকে নিয়ে বিভিন্ন মহল নিয়মিতভাবে অপমানজনক মন্তব্য করে থাকে। অন্য সব পেশাজীবী গোষ্ঠীর দাবি মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো টালবাহানা দেখা যায় না, অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সামান্য যৌক্তিক দাবি তুললেই দেশের অর্থনীতির দুর্বলতার অজুহাত সামনে আনা হয়।
গত ১৩ আগস্ট এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় ১২ জন শিক্ষক নেতাকে সচিবালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে শিক্ষক প্রতিনিধিরা জানালেন, পূর্ববর্তী শিক্ষা উপদেষ্টার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় তাঁরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের একদল প্রতিনিধি তখন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন—“আপনারা তো বেতন পান না, পান ভাতা। তাই আপনাদের দাবিদাওয়া পূরণে আইনি জটিলতা আছে।” বিষয়টি নিঃসন্দেহে হাস্যকর। একজন শিক্ষক যদি মাসভর ৯৭% শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকেন, তাহলে তাঁর প্রাপ্ত অর্থকে কেবল ‘ভাতা’ বলা হয় কীভাবে? যদি শিক্ষকদের এভাবে ভাতা প্রদান করা যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সরকারি দপ্তরের আমলারা সারাদিন যে কাজ করেন, তাঁরা কি তবে বেতন পান নাকি ভাতা?
আমাদের শিক্ষক সমাজের প্রশ্ন—যদি আমরা সত্যিই জাতির কোনো উপকারে না আসি, তবে এই পেশা কেন রাষ্ট্র টিকিয়ে রেখেছে? যদি আমাদের শ্রমকে বেতন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় কারও বিবেকে বাধে, তবে সেই যুক্তিতে আমরাও বলতে পারি—আমাদের শ্রমকে দয়া কিংবা দান হিসেবে দেখার অধিকার কারও নেই। শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ মানে মজুরি, যা বেতনের অন্য নাম।
এখানে আরও একটি তুলনা জরুরি। দূর্নীতির দায়ে কতজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক অভিযুক্ত হয়েছেন? হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া এই তালিকা প্রায় শূন্য। অথচ অন্য পেশার মানুষদের মধ্যে দূর্নীতির অভিযোগ এতই ব্যাপক যে, গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়। তবুও শিক্ষকদের সৎ শ্রমকে অবমূল্যায়ন করা হয়, অথচ সমাজের অন্য পেশাজীবীদের অনৈতিক আয়ের বৈধতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না।
অতএব, এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা আজ দৃঢ়ভাবে জানাতে চান—আমরা কারও施কৃপা বা দয়া ভিক্ষায় বেঁচে নেই। আমরা শ্রমের মর্যাদা চাই, আমাদের প্রাপ্য বেতন চাই। যারা বলেন আমরা বেতন পাই না, পাই ভাতা, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই—এ বক্তব্য শুধু শিক্ষকদের অপমান নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা। তাই এই বিষয়ে দেশের প্রতিটি শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং বিবেকবান নাগরিককে সোচ্চার হতে হবে। কারণ শিক্ষকের মর্যাদা হরণ মানে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া।
Leave a Reply