আন্দোলন মূলত মানুষের দাবি-দাওয়ার প্রতিফলন, ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে—যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বা আমাদের দেশের ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ। এসব আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদই পারে অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে। তবে প্রতিটি আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছায় না। অনেক আন্দোলন মাঝপথেই থমকে যায়—কখনো নেতৃত্বের দুর্বলতা, কখনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কখনো সরকারের দমননীতি, আবার কখনো বাইরের স্বার্থান্বেষী মহলের কৌশলগত প্রভাবে। এর ফলে একটি সম্ভাবনাময় আন্দোলনের অপমৃত্যু ঘটে, যা আন্দোলনের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়।
কোনো আন্দোলনকে ঘনীভূত করা কিন্তু এতটা সহজ কাজ নয়। আপনি শুধু আহ্বান জানালেন আর সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসবে—এমনটা ভাবা ভুল। মানুষের ভেতরের মনের কথা, তাদের দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনার প্রতিফলন যদি আন্দোলনের ভাষায় প্রকাশ না পায়, তবে তারা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেবে না। এ কারণেই বলা যায়, ১৩ আগস্টের আন্দোলনটি প্রাথমিকভাবে শিক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণে সফল হলেও এর পরিণতি আশানুরূপ হয়নি। জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের ব্যানারে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি শুরুতে জোরালোভাবে শিক্ষকদের আশা জাগালেও, শেষ পর্যায়ে এসে কিছু দুর্বলতা আন্দোলনটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রথমত, আন্দোলনের ডাকদাতা সংগঠন শুরুতে বারবার বলছিল, তাদের এক দফা এক দাবী—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ ছাড়া তারা মাঠ ছাড়বেন না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সচিবালয়ে গিয়ে প্রতিনিধিরা এ দাবি নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নেননি। বরং ফিরে এসে বলেছেন, জাতীয়করণ একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা এখনই সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো—তারা কি আগে থেকেই জানতেন না যে এটি দীর্ঘমেয়াদি দাবি? যদি জেনেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, তবে সেটি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
দ্বিতীয়ত, আলোচনার পর প্রতিনিধি দলের দাবি ছিল যে তাদের চাপের কারণেই বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও কর্মচারীদের উৎসব ভাতার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব ভাতার প্রস্তাব আগে থেকেই প্রশাসনিক পর্যায়ে নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ এটিকে নতুন কোনো সাফল্য বলে প্রচার করা শিক্ষকদের সঙ্গে শিশুতোষ কৌশলে প্রতারণার সমান। তাছাড়া, শিক্ষকদের কাছ থেকে ভাতার হিসাব চাওয়ার ঘটনাটি অযৌক্তিক ও সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছু নয়, কারণ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সংখ্যা প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয় এবং সেটির স্বয়ংক্রিয় হিসাব সরকারিভাবেই সংরক্ষিত থাকে। আপনাদের সাথে যেটা করা হয়েছে তা তারা শুধু সময়ক্ষেপন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। কারণ আপনার ও আমার পক্ষে কখনই পরিপূর্ণ হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। আপনাদের নিকট থেকে হিসাব নিয়ে তারা বলবে যে, শিক্ষকদের দেওয়া হিসাবের সাথে তাদের হিসাবের অনেক পার্থক্য বিধায় এই মুহুর্তে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী যারা আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিলেন, তাদের মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নেতৃত্ব যদি আন্দোলনের সঙ্গীদের সঙ্গে আস্থা ও পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিত, তবে অংশগ্রহণকারীদের বিশ্বাস ও একাত্মতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। কিন্তু একতরফা সিদ্ধান্ত নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ইতিহাসে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৯৮০-এর দশকে বেশ কয়েকটি শিক্ষক আন্দোলন জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও ব্যর্থ হয়েছিল মূলত নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ঐক্যের অভাবের কারণে।
চতুর্থত, আন্দোলনের পূর্বে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা লক্ষ্য করা যায়নি। যে কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের সাফল্যের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা অপরিহার্য। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে করণীয়, বিকল্প কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল না থাকলে আন্দোলন সফল হয় না। ১৩ আগস্টের কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এ ঘাটতি চোখে পড়েছে।
মূলত, একটি আন্দোলনের প্রাণশক্তি হলো জনসমাগম, কিন্তু সে শক্তিকে যদি যথাযথভাবে কাজে লাগানো না যায় তবে আন্দোলনের মুহূর্তের মধ্যেই অপমৃত্যু ঘটে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আন্দোলনের ব্যর্থতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো নেতৃত্বের দুর্বলতা, বিভক্তি এবং স্বচ্ছ কৌশলের অভাব। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও ঐক্যই তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, আমাদের দেশের শিক্ষক আন্দোলনের মতো অনেক আন্দোলনই আশার আলো দেখালেও দুর্বল নেতৃত্ব, সরকারি দমননীতি এবং অযৌক্তিক প্রত্যাশার কারণে থেমে গেছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী মহলের কৌশলও আন্দোলনের অপমৃত্যু ঘটায়। সরকার যখন আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, মামলা, অর্থনৈতিক চাপ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, তখন অনেকেই নিরাপত্তার কারণে পিছিয়ে যান। পাশাপাশি দাবি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা কর্মীদের ভেতরে হতাশা তৈরি করে। এর সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার বা নেতিবাচক প্রচারণা আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন দুর্বল করে দেয়।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, আন্দোলনের সাফল্য শুধু দাবি তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নেতৃত্বের ঐক্য, দূরদর্শী পরিকল্পনা, সঠিক কৌশল, জনআস্থা রক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা—এসবই সফল আন্দোলনের পূর্বশর্ত। এসব শর্ত পূরণ না হলে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় আন্দোলনও ব্যর্থতার গ্লানিতে নিমজ্জিত হয়। ১৩ আগস্টের আন্দোলনটি শিক্ষক সমাজের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা সৃষ্টি করলেও, শেষ পর্যন্ত সেটি অপূর্ণ থেকে গেছে। এর ফলেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়েছে, যা আসলে আন্দোলনের অপমৃত্যুর এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
Leave a Reply