বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যে কয়টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা। এদের অনেকেই এমপিওভুক্ত – অর্থাৎ সরকার তাদের বেতন-ভাতা দেয়, কিন্তু তারা সরকারি কর্মচারী নন। এই শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন, বিশেষ করে যখন তাদের যৌক্তিক চাওয়া-পাওয়ার বাস্তবায়নের প্রশ্ন আসে। এদের বঞ্চনার কথা যদি রাত দিন মিলিয়ে লেখা যায় তাহলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যাবে কিন্তু শেষ হবে না। এমনিতেই এই পেশায় সুযোগ সুবিধা তুলনামুলকভাবে এদেশের অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে কম। এমনকি অধিকাংশ বেসরকারী বা প্রাইভেট সেক্টরের চেয়েও কম। তারপর আবার রয়েছে এপেশার উর্দ্ধতন মহলের নানাবিধ শোষণ ও বঞ্চনা।
দেশের অন্যান্য খাতে – যেমন প্রশাসন, পুলিশ, স্বাস্থ্য কিংবা অন্যান্য মন্ত্রণালয় – নানা সুবিধা, বেতন বৃদ্ধি কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায়, সকালে আলোচনার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হয়, তার প্রজ্ঞাপন বিকেলেই জারি হয়ে যায়। অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সেই একই প্রক্রিয়া চলে ধীরগতিতে। এতটাই ধীরগতি যে, কখনও কখনও তা মাস পেরিয়ে যায় তারপরও দীর্ঘসুত্রীতা কমে না।
সম্প্রতি একটি উদাহরণ দেওয়া যাক –
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে আজ হতে দেড় মাস আগে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্মতিও মিলেছে প্রায় ১০ দিন আগে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এতে প্রশ্ন ওঠে: কেন এই দেরি? কাদের স্বার্থে এই দীর্ঘসূত্রিতা?
এই বৈষম্যের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে:
১.নৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকতা পেশাকে মুখে শ্রদ্ধা জানানো হলেও, বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাদের গুরুত্ব অনেক সময় কমে যায় বা থাকে না।
২.প্রক্রিয়াগত জটিলতা: এমপিওভুক্ত কাঠামোটি একটি ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা – সরকারি বেতন, বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ – যার কারণে দায়িত্ব ভাগাভাগি অস্পষ্ট থাকে।
৩.বাজেট বরাদ্দ ও কৌশলগত টানাপোড়েন: অর্থ মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কিংবা বাজেট অগ্রাধিকারের ব্যবধানও প্রজ্ঞাপন জারির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
৪.চাপের অভাব: শিক্ষকরা পেশাগতভাবে সংগঠিত হলেও অনেক সময় পর্যাপ্ত মিডিয়া কাভারেজ বা জনসচেতনতা তৈরি করতে পারেন না, যা অনেক সময় প্রশাসনকে চাপমুক্ত রাখে। দুর্বল নেতৃত্ব অনেকাংশে দায়ী।
এই প্রশ্নটি প্রতিটি সচেতন নাগরিক এবং নীতিনির্ধারকের সামনে তোলা জরুরি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে এমন আচরণ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর তার প্রভাব পড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি তাহলে এ পেশার প্রতি আগ্রহ দেখাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি এ পেশার প্রতি আগ্রহ না দেখায় তাহলে কি এ পেশার বিকাশ কি ভাবে ঘটবে বলতে পারেন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনো অনৈতিক দাবি করছেন না – তারা শুধু সময়মতো ন্যায্য প্রাপ্য পেতে চাচ্ছেন। তাই সরকারকে আরও কার্যকর, সমন্বিত এবং শিক্ষাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যাতে এই পেশার প্রতি তরুন প্রজন্ম যথেষ্ট আগ্রহী হয়। আর তরুন প্রজন্ম তখনই আগ্রহী হবে যখন এই পেশার উপর থেকে আমলাতান্ত্রিক রোষানল দুর হবে। এমপিওভুক্ত পেশার অধিকাংশ সমস্যাগুলো আমলাতান্ত্রিক।
পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষকদের উপর। আর যদি সেই শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হন, তাহলে শিক্ষার মানও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সময় এসেছে – শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, তা দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমেই শিক্ষকদের প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া।
Leave a Reply