দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে সরকার ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) পদ্ধতি চালু করেছে, যাতে শিক্ষক-কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন পান—কোনো ধরণের ভোগান্তি ছাড়াই। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এর সুফল পাচ্ছেনও।
কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য চালু হওয়া ইএফটি যেন শুধু নামে ইএফটি, কাজে নয়। বছরের পর বছর ধরে যেই বেতন-বিলম্বের যন্ত্রণা তাঁরা সহ্য করছেন, তা এখনো থেকে গেছে—শুধু মাধ্যমটা পাল্টেছে, অভিজ্ঞতা নয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে শুধু প্রতিশ্রুতি আসে, সমাধান নয়। মাসের পর মাস ধরে ‘ধাপে ধাপে’ বেতনের প্রস্তাব পাঠানো হয়, তারপর ‘ধাপে ধাপে’ অনুমোদন। এই ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াতেই হারিয়ে যাচ্ছে সময়, ধৈর্য আর মর্যাদা।
মাউশি দায় চাপায় শিক্ষকদের ঘাড়ে, বলে—তথ্য ভুল। অথচ EMIS-এর মাধ্যমে প্রতি বছর শিক্ষকরা তথ্য হালনাগাদ করে থাকেন। যদি তথ্য সত্যিই ভুল হতো, তাহলে তা প্রাথমিক যাচাইয়েই ধরা পড়তো। প্রশ্ন ওঠে: তাহলে দায় কার?
সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে iBAS++ অটোমেটেড সিস্টেমে নির্দিষ্ট তারিখে বেতন চলে যায়, সেখানে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বেতন যায় “ধাপ অনুযায়ী চিঠি আসলে, অনুমোদন হলে, ব্যাচ হলে, ছাড় হলে”—এরপর।
তথ্য সংশোধনের অজুহাতে অনেক শিক্ষককে একধাপ বাদ দিয়ে পরের ধাপে রাখা হয়, কখনো কখনো বাদই পড়েন। অনেক সময় ঈদের বোনাস পাওয়ার আগেই ঈদ চলে যায়।
ইএফটি চালুর মূল লক্ষ্য ছিল — বেতন বিলম্ব ও হয়রানি বন্ধ করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।
শিক্ষকরা বলছেন:
“এই ইএফটি আমাদের জীবনকে আরও অতিষ্ট করে তুলেছে।”
সত্যিই, যখন প্রযুক্তি উন্নয়ন ভোগান্তি কমিয়ে বরং বাড়িয়ে দেয়, তখন তা আর উন্নয়ন নয়—বরং দায়বদ্ধতার ঘাটতি।
EFT যদি ঠিকভাবে কার্যকর না হয়, তবে এটি শুধু একটা কৌশলী প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে। শিক্ষকগণ প্রযুক্তির শিকার হবেন, সুবিধাভোগী নয়। শিক্ষা খাতের ভিত্তি যাঁরা গড়ে দেন, সেই শিক্ষককেই যদি তাঁর ন্যায্য সম্মান ও সময়মতো বেতন দিতে না পারি—তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ কাকে বলে? এভাবে যদি প্রতি মাসে ইএফটি সুবিধা চালু থাকার পরও বেতন প্রদানের জটিলতা হয় তাহলে কি লাভ এই ইএফটি। প্রযুক্তি গ্রহণ যদি কোন সুবিধা দিতে না পারে তাহলে সেই প্রযুক্তি গ্রহণ করে লাভ কি? পরক্ষণেই আবার এটাও ভাবায় সকল প্রতিষ্ঠানই যেখানে ইএফটি বাস্তবায়নের ফলে বেতন প্রদানের জটিলতা বের হয়ে আসতে পারছে সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ভোগান্তি বেড়েছে। তাহলে দোষ কার ইএফটি সিষ্টেমের না যারা ইএফটি নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের। দোষ কি ইএফটি ব্যবস্থার নাকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য মাউশির চালুকৃত এই বিশেষ ইএফটির।
এই সমস্যার সমাধান শুধু আশ্বাস নয়, প্রকৃত স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ আর প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারেই সম্ভব।
Leave a Reply