এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বাড়বে কিনা—এ নিয়ে কিছুদিন ধরেই অনিশ্চয়তা ছিল। এর আগে উৎসব ভাতা বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় নাকচ করায় বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাই শেষে শর্ত পূরণ করলে এমপিওভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।
তবে এবার শিক্ষাখাতের উন্নয়নের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন মোট ৮৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট চেয়েছেন। এই প্রস্তাবের মধ্যে শিক্ষকদের ১০ শতাংশ উৎসব ভাতা বৃদ্ধি, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি, অবসর ও কল্যাণ ভাতা এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে এসব খাতে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে।
২১ এপ্রিল পাঠানো শিক্ষামন্ত্রীর চিঠি পরদিনই অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর আগে ৮ এপ্রিলও একই ধরনের একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল, যেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৬০ হাজার ৪৯৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। তবে তখন অনুমোদন দেওয়া হয় ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
পরবর্তীতে নতুন করে আরও প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। নতুন চিঠিতে বলা হয়, ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় সভায় পরিচালন ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও চূড়ান্ত বাজেট সিলিং নির্ধারণের সময় উন্নয়ন ব্যয় কিছুটা বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় কমানো হয়েছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৮০ দিনের পরিকল্পনার জন্য ৪৪৮ দশমিক ৩০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এরপরের ১০ মাসের জন্য আরও ৯ হাজার ৩৩০ দশমিক ৫০ কোটি টাকা দরকার হবে। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরের জন্য ইশতেহার বাস্তবায়নে মোট ৯ হাজার ৭৮০ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রয়োজন।
অবসর সুবিধা বোর্ডে এপ্রিল পর্যন্ত ৫৯ হাজার ৮২০টি আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে, যা নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে কল্যাণ ট্রাস্টে মার্চ পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৮২৪টি আবেদন ঝুলে আছে, যা নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন ২ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। এসব বিবেচনায় অবসর সুবিধা বোর্ডে ৩০০ কোটির পরিবর্তে ২ হাজার কোটি এবং কল্যাণ ট্রাস্টে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় ৩২টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৮ হাজার ১৭৫ দশমিক ৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। পরিচালন বাজেটের আওতায় বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে—যেমন বেতন-ভাতা, ক্রীড়া সামগ্রী, ই-জিপি ক্রয় প্রক্রিয়া ইত্যাদি।
বৃত্তি ও উপবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যার ফলে বৃত্তিখাতে অতিরিক্ত ১৫১ কোটি টাকাসহ মোট ৪৫১ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে আরও ৪০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
নতুন শিক্ষক নিয়োগ, বাড়িভাড়া ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধির জন্য এমপিও খাতে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৮৯ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসের অনুষ্ঠান ব্যয়, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লিফট ব্যবস্থাপনা, ছুটি নগদায়ন, জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সর্বমোট হিসাব অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের জন্য অতিরিক্ত ১৩ হাজার ৭০০ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা প্রয়োজন, যার মধ্যে পরিচালন খাতে ৫ হাজার ৫২৪ দশমিক ৬৫ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৮ হাজার ১৭৫ দশমিক ৯০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জন্যও অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত ২৯ হাজার ২০৯ দশমিক ৪৮২০ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মোট ব্যয়সীমা দাঁড়াবে ৮৬ হাজার ৫১১ দশমিক ১৬২০ কোটি টাকা। এই ব্যয়সীমা নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে।
Leave a Reply