চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরীর স্কুল-কলেজে অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশনার অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও অনলাইন, কোথাও আবার সশরীরে ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দোটানা তৈরি হয়েছে। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সুসংগঠিত পরিকল্পনা ছাড়া এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে ক্লাস চালুর ঘোষণা দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহ থেকেই রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ এবং গাজীপুরের একটি মাদ্রাসাসহ কিছু প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর কথা রয়েছে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে—সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। ফলে বাস্তবে কোন প্রতিষ্ঠান অনলাইনে যাবে আর কোনটি সশরীরে ক্লাস চালিয়ে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুধু অনলাইন ক্লাস নয়, অফলাইন বা সশরীরে পাঠদান নিয়েও একই ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাসে যেতে চায় না, তাদের ক্ষেত্রে শনিবার ক্লাস চালু থাকবে কি না—এমন মৌলিক প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই।
যদিও শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, অনলাইনে না যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে এবং তারা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এই দাবির সত্যতা মিলছে না। ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের অন্তত ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখনো পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে কোনো লিখিত নির্দেশনা পাননি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা সার্বিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। কখনো বলা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু হবে, আবার কখনো বলা হচ্ছে মহানগরীর সব স্কুল-কলেজে এটি প্রযোজ্য হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ফলে অনলাইন ক্লাস নিয়ে সরকারের অবস্থান কী—তা পরিষ্কার নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা থাকা আরও জরুরি। কিন্তু অনলাইন-অফলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে এই জায়গাতেই বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অস্পষ্টতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এবং একই শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হবে।
এ অবস্থায় কেউ সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাসের সুযোগ পাবে, আবার কেউ পাবে পাঁচ দিন। একইভাবে শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও কর্মদিবসের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হবে। এতে করে শিক্ষার মান ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবর রহমান বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তিনি মনে করেন, সংকটকালীন সময়ে একটি সুপরিকল্পিত বিকল্প শিক্ষা নীতি থাকা উচিত ছিল, যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত। পরিকল্পনা ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সংকট আরও বাড়বে। তার মতে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই ভঙ্গুর; এ ধরনের অপরিকল্পিত পদক্ষেপ সেটিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন ক্লাস বাস্তবায়নে ডিভাইস সংকট, নেটওয়ার্ক সমস্যা এবং অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করবে। গুগল মিট বা জুমে ক্লাস নেওয়াকে অনলাইন শিক্ষা বলা হলেও এটি আসলে তার একটি ছোট অংশ মাত্র। করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের কারণে যে শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। নতুন করে একই পদ্ধতি চালু করলে সেই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
তিনি বিকল্প হিসেবে সকালে ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাব দেন, যেখানে এসি বন্ধ রেখে কেবল ফ্যান ও লাইট ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। তার মতে, যথাযথ প্রস্তুতি ও নীতিমালা ছাড়া অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়। তারা বুঝতে পারছে না, চলতি সপ্তাহে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হবে নাকি বাসা থেকে অনলাইনে ক্লাস করতে হবে। এতে তাদের পড়াশোনার প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ সন্তানদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, দ্রুত একটি স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশনা প্রয়োজন। কোন কোন প্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাসে যাবে এবং কোনগুলো সশরীরে ক্লাস চালাবে—তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। পাশাপাশি অফলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে কতদিন ক্লাস হবে এবং শনিবার ক্লাস চলবে কি না—এসব বিষয়ও পরিষ্কার করা দরকার।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষাব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট-এর সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজীজি অনলাইন ক্লাসের বিরোধিতা করে বলেন, করোনাকালে অনলাইন শিক্ষার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। তখন মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশগ্রহণ করত। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নতুন করে অনলাইন ক্লাস চালু হলে আবারও ‘অটোপাস’ সংস্কৃতি জোরদার হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। শিক্ষার্থীরা পাঁচ দিন ক্লাসে অভ্যস্ত; সেখানে ছয় দিন ক্লাস চালু করা বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা উপেক্ষা করা হয়েছে, যা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
Leave a Reply