অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তাবে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকরা একযোগে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অব্যাহত রাখার পক্ষে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাদের অভিমত অনুযায়ী, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়—বিশেষ করে প্রয়োজনীয় ডিভাইসের অভাব, ইন্টারনেট ব্যবহারের বাড়তি খরচ এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার সীমাবদ্ধতা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি তারা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি করছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা এসব উদ্বেগের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। সভায় তারা জোরালোভাবে মত দেন যে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালু রাখাই সবচেয়ে কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত পন্থা।
আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নিশাত তিথি তার বক্তব্যে জানায়, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে সে কোনোভাবেই অনলাইন ক্লাসকে সমর্থন করে না। তার মতে, অনলাইন ক্লাসে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়, যার ফলে পড়াশোনায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কামাল হোসেন। তিনি বলেন, অনলাইন ক্লাসের ধারণাটি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ প্রসঙ্গে তিনি কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তখন অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তারা নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়েছেন, যা শিক্ষার মানকে ব্যাহত করেছিল।
অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও সরাসরি ক্লাস চালু রাখার দাবি জোরালোভাবে উঠে আসে। হজরত শাহ আলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর অভিভাবক শাহিদা বেগম বলেন, তারা চান না যে অনলাইন ক্লাস চালু করা হোক। বরং যেখানে পাঁচ ঘণ্টার ক্লাস নেওয়া হয়, সেখানে সময় কমিয়ে তিন ঘণ্টা করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা স্বল্প সময়ে হলেও সরাসরি ক্লাসে অংশগ্রহণ করে কার্যকরভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক প্রতিনিধি আক্তার তার বক্তব্যে বলেন, ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের চোখের সমস্যা এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি মনে করেন, যানজট কমানোর জন্য অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে স্কুল বাস বা গ্রুপ ট্রান্সপোর্ট চালুর মতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নিরাপদ ও কার্যকর হবে।
শিক্ষক সমাজ থেকেও এ বিষয়ে বিভিন্ন বাস্তবসম্মত প্রস্তাব আসে। নারিন্দা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দা আক্তার প্রস্তাব দেন, প্রতিদিনের ছয়টি পিরিয়ডের পরিবর্তে চারটি পিরিয়ড করা যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য এসি বন্ধ রেখে দিনের আলোতে ক্লাস নেওয়া যেতে পারে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত উঠে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আব্দুস সালাম বলেন, সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার-শনিবারের পরিবর্তে এলাকাভেদে ভিন্ন দিনে নির্ধারণ করা হলে যানজট কমানো এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়া তিনি কার-পুলিং পদ্ধতি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যেখানে এক গাড়িতে একাধিক ব্যক্তি যাতায়াত করলে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, কোনো অবস্থাতেই শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত নয়। তিনি মনে করেন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখতে হবে, যাতে এটি কোনোভাবে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত না হয়।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো দেশে একযোগে নয়, বরং সীমিত পরিসরে কিছু নির্ধারিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে হাইব্রিড বা ব্লেন্ডেড শিক্ষাপদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসের সমন্বয় করা হবে। শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, নগরীর যানজট এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর মতো কিছু প্রতিষ্ঠানকে এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।
ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার দিকনির্দেশনা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, নতুন প্রজন্মের জন্য আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাধারা ধীরে ধীরে চালু করা হবে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত জানতে চাইলে, ‘ইয়েস’ অথবা ‘নো’—এই দুই বিকল্পের মধ্যে সাড়া দিতে বলা হয়। তখন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে ‘ইয়েস’ বলে সমর্থন জানায়, যা নতুন শিক্ষাপদ্ধতির প্রতি তাদের আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।
Leave a Reply