শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, অনলাইন ক্লাস মূলত মহানগরভিত্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য—মফস্বল বা গ্রামীণ এলাকার বিষয়ে তিনি এই মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিচ্ছেন না। শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে কুমিল্লা অঞ্চলের বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে অনলাইন ক্লাস নিয়ে প্রচলিত ধারণারও ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, অনলাইন ক্লাস চালু হলে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ বাড়ে—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ একটি স্কুলে যখন ক্লাস চলে, তখন প্রায় ৫০-৬০টি ফ্যান একসাথে চালু থাকে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বাসায় থাকলে সাধারণত একটি ফ্যানই ব্যবহার হয়। তাছাড়া অনেক বাড়িতেই এখন আইপিএস বা সোলার বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে, যা এই চাপকে আরও কমিয়ে আনে।
পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, চলতি বছরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশের হার যদি শূন্য হয়, তবুও তাদের এমপিও সুবিধা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে না; বরং একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ দেওয়া হবে। তবে একইসঙ্গে প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এই ক্যামেরা স্থায়ীভাবে রাখা হবে, যাতে শুধু পরীক্ষা নয়, ক্লাসরুমের পাঠদান কার্যক্রমও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়।
কোচিং সেন্টার নিয়েও তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ধাপে ধাপে বেসরকারি কোচিং সেন্টার বন্ধ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই ‘ইনহাউজ কোচিং’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে দুর্বল, সেই বিষয়ে আলাদা করে পাঠদান করা হবে, ফলে কোচিং নির্ভরতা কমবে এবং শিক্ষার মান বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল একটি প্রশাসনিক খাত নয়; এটি একটি জাতি গঠনের মূল ভিত্তি এবং এক ধরনের পবিত্র দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার যে ভিশন নির্ধারণ করা হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নকলমুক্ত, সুশৃঙ্খল এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
অতীত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে নকলবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে শিক্ষার গুণগত মান দৃশ্যমানভাবে উন্নত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে সেই ধারা ব্যাহত হয়। এখন সরকার আবার সেই ইতিবাচক অবস্থায় ফিরে যেতে চায়, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রশাসন সম্মিলিতভাবে একটি সৎ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে।
তিনি শিক্ষা কার্যক্রমকে ‘সাদকায়ে জারিয়া’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, একজন শিক্ষক যখন একজন শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন, তখন তা শুধু একটি পেশাগত দায়িত্ব নয়—বরং এটি একটি স্থায়ী সওয়াবের কাজ। এই কারণেই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি ‘ইবাদতখানা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় নকল প্রতিরোধে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন আধুনিকায়নের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। মন্ত্রী জানান, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে, যাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংঘটিত নকলসহ সব ধরনের অসদুপায় কঠোরভাবে দমন করা যায়। নতুন প্রস্তাবনায় কেন্দ্র সচিব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে নকলের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। প্রয়োজনে পরীক্ষা শেষে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও র্যান্ডম চেকিং চালু করা হবে, যাতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ থাকে।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ও নীতিনিষ্ঠার যে ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, সেটিই বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রজন্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। তারা একটি সৎ ও ন্যায্য সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি আলোকিত, শিক্ষিত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
মতবিনিময় সভায় কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. জসীম উদ্দিন, কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী, কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মান্নান, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ মোল্লা, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানবৃন্দ, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিরা এবং কুমিল্লা অঞ্চলের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্র সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply