মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এই উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, আইসিটি আইন, মিডিয়া লিটারেসিসহ সময়োপযোগী নানা বিষয় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও তারা সচেতনতা অর্জন করবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য আইসিটি বইয়ে যুগোপযোগী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিয়ে কনটেন্ট ম্যাপিং ও গ্যাপ অ্যানালাইসিস সম্পন্ন করে একটি চূড়ান্ত শিট তৈরি করেছেন।
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, ন্যানো টেকনোলজি, স্মার্ট হোম ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সম্পর্কে ধারণা যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে স্টারলিংক কীভাবে কাজ করে, ক্লাউড কম্পিউটিং, ক্যানভা ব্যবহার করে প্রেজেন্টেশন তৈরি, এআই দিয়ে ছবি প্রক্রিয়াকরণ, ভিডিও এডিটিং, সাইবার বুলিং, অনলাইন গুজব, সাইবার নিরাপত্তা ও আইন, স্প্যামিং এবং মিডিয়া লিটারেসি—এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের আইসিটি বইকে আধুনিক করতে মার্চের ২ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পাঠ্যবইয়ের কনটেন্ট উন্নয়ন ও যুগোপযোগীকরণ’ শীর্ষক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাধ্যমিক পর্যায়ের বইয়ে নতুন কনটেন্ট সংযোজনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইয়ে নতুন বিষয় যুক্ত করার পাশাপাশি কিছু অধ্যায়ের নাম পরিবর্তন ও নতুন অধ্যায় সংযোজন করা হয়েছে। যেমন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি’ পরিবর্তন করে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপাদানসমূহ’ করা হয়েছে। ‘ওয়ার্ড প্রসেসিং’ পরিবর্তন করে ‘আমার আঁকাআঁকি ও লেখালেখি’ করা হয়েছে। এছাড়া ‘প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান’ নামে নতুন অধ্যায় যুক্ত হচ্ছে, যেখানে আগে মোট ৫টি অধ্যায় ছিল।
সপ্তম শ্রেণিতেও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি’ পরিবর্তন করে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপাদানসমূহ’ করা হয়েছে এবং ‘নিরাপদ ও নৈতিক ব্যবহার’ পরিবর্তন করে ‘আমার লেখালেখি’ করা হয়েছে। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে ‘প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান’ নামে নতুন অধ্যায় সংযোজন করা হচ্ছে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে আইসিটির পরিচিতি অংশে ভিডিও কনফারেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসের ব্যবহার সংযুক্ত করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ একত্র করে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে এবং ‘আমার আঁকাআঁকি ও লেখালেখি’ অধ্যায়ে বিস্তারিত পাঠ বিন্যাস করা হবে। নতুন প্রোগ্রামিং অধ্যায়ে গল্পের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ধাপ এবং স্ক্র্যাচ প্রোগ্রামিং শেখানো হবে।
সপ্তম শ্রেণিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রোবোটিকস ও আইওটির প্রাথমিক ধারণা যুক্ত হচ্ছে। থ্রিডি প্রিন্টার ও ভিআর গ্লাস সম্পর্কে তথ্য অন্তর্ভুক্ত হবে। পুরোনো কিছু পাঠ বাদ দিয়ে নতুন পাঠ সংযোজন করা হচ্ছে। ইউনিকোডভিত্তিক লেখা, গুগল ডকস, সাইবার বুলিং ও অনলাইন গুজব সম্পর্কেও নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। অ্যালগরিদম ও সুডোকোড শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণিতে রোবোটিকস, আইওটি, স্মার্ট হোম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নতুন পাঠ থাকবে। ইয়াহুর পরিবর্তে জিমেইল ব্যবহার শেখানো হবে। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, জিও-লিও-মিও কক্ষপথ, ক্লাউড কম্পিউটিং সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হবে। এক্সেল ও গুগল শিট ব্যবহার করে গ্রাফ তৈরির পাঠ যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রোগ্রামিংয়ের বিভিন্ন ধাপ শেখানো হবে।
নবম-দশম শ্রেণিতে অধ্যায়ের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও কনটেন্ট আপডেট করা হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, ন্যানো টেকনোলজি, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, ডিজিটাল টুইন, ক্যানভা দিয়ে প্রেজেন্টেশন, এআই-ভিত্তিক ছবি প্রক্রিয়াকরণ ও ভিডিও এডিটিং অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মিডিয়া লিটারেসি, অনলাইন জুয়া, সাইবার নিরাপত্তা, হ্যাকিং, ফিশিং ও ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। মূলত আপডেট প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকায় এই বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তাই বর্তমান আইসিটি বইয়ের সীমাবদ্ধতা দূর করে সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা মু. আবদুল্লাহ আল যোবায়ের বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতেই ২০২৭ সালের জন্য নতুন আইসিটি বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানান, নতুন শিক্ষাবর্ষের আইসিটি বইকে আধুনিক ও বাস্তবমুখী করতে এই পরিমার্জন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
Leave a Reply