ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুতর অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কায় পড়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতও দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে অনলাইন ক্লাসের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। বাংলাদেশেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ইতোমধ্যে একটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ অনলাইন ক্লাস চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সম্পূর্ণভাবে অনলাইন শিক্ষায় চলে গেলে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ কারণে একেবারে অনলাইন বা পুরোপুরি সশরীরে ক্লাসের পরিবর্তে দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে স্কুল পর্যায়ে কীভাবে অনলাইন ও সশরীরে ক্লাস একসঙ্গে পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব আগামী বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের শুরুর দিকে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে সরকার সেই সীমাবদ্ধতা সাময়িকভাবে তুলে নেয়। বর্তমানে আবার অনেক পাম্পে সীমা আরোপ থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও তেলের পাম্পগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) দেশটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা বা ছুটি পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ যানবাহনের সারি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও কোথাও তেল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
অনেক গাড়িচালক এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অধিকাংশ স্টেশনে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। ফলে পরিবহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও, বিশেষ করে যেগুলো দীর্ঘদিন পর স্বাভাবিকভাবে চালু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে এখনো বড় আকারের জ্বালানি সংকট তৈরি না হলেও অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজের মাধ্যমে সরবরাহে বিলম্ব এবং সীমিত মজুতের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, পরিবহন সংকট তীব্র হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে করোনাকালীন সময়ের মতো আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
Leave a Reply