বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে বর্তমানে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি—এমনটাই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে এ নিয়ে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা শিগগিরই আলাদা বা স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর আওতায় আসতে যাচ্ছেন। এমনকি কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালেও একই ধরনের খবর প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার নাম বা বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি।
মূলত গত ২৫ মার্চ থেকে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে এই তথ্য ছড়াতে শুরু করে। এতে শিক্ষক সমাজের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়। তবে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা স্পষ্টভাবে জানান, এ ধরনের কোনো প্রস্তাব বা আলোচনা এখনো তাদের পর্যায়ে আসেনি। তাদের ভাষায়, “এ বিষয়টি প্রথমবারের মতো আপনাদের কাছ থেকেই শুনলাম। বাস্তবে এমন কোনো আলোচনা হয়নি। কারা বা কী উদ্দেশ্যে এ ধরনের তথ্য ছড়াচ্ছে, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবে।”
এ বিষয়ে আরও নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) মো. মিজানুর রহমান জানান, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল নির্ধারণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি সংক্ষেপে বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।”
এছাড়া সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোনো স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন করার ক্ষমতা মূলত বাংলাদেশ সার্ভিস কমিশনের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো চালু করা হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এই সংস্থাটি। যদি কমিশন থেকে এ ধরনের কোনো সুপারিশ আসে, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটি নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নবম পে-স্কেল প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও জোট শিক্ষকদের বেতন ও সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। এসব প্রস্তাবে শিক্ষকদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের শিক্ষকদের জন্য মূল বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্রতি বছর ২.৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট, ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া এবং ১ হাজার ৫০০ টাকা শিক্ষা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
একইভাবে দ্বিতীয় গ্রেডের জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৯৫ হাজার টাকা এবং ষষ্ঠ গ্রেডে ৮০ হাজার টাকা মূল বেতন প্রস্তাব করা হয়েছিল।
পরবর্তী গ্রেডগুলোতে যথাক্রমে সপ্তম গ্রেডে ৭০ হাজার, অষ্টম গ্রেডে ৬২ হাজার, নবম গ্রেডে ৫৫ হাজার, দশম গ্রেডে ৫০ হাজার, একাদশ গ্রেডে ৪৫ হাজার, দ্বাদশ গ্রেডে ৪০ হাজার এবং ত্রয়োদশ গ্রেডে ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সর্বনিম্ন চতুর্দশ গ্রেডের জন্য প্রস্তাবিত মূল বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা।
প্রস্তাবনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, অন্যান্য গ্রেডেও বিভিন্ন হারে বেতন ও ভাতাদি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র মূল বেতনই নয়, বরং সামগ্রিক আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
সবমিলিয়ে বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে বর্তমানে কোনো বাস্তব সিদ্ধান্ত বা অগ্রগতি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ সংক্রান্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই ছাড়া বিশ্বাস না করার জন্য সংশ্লিষ্টরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
Leave a Reply