দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও ধারাবাহিক দাবির পর অবশেষে দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের বিষয়টি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নবম পে-স্কেলের আওতাভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বহু বছর ধরে নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি পৃথক বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মনোভাব এই দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রবর্তনের লক্ষ্যে একটি পরিপত্র জারির প্রস্তুতি চলছে। যদিও এখনো এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি, তবে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে এবং প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন। এতে করে ধারণা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতেই এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পে-কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। কমিশনের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশ সার্ভিস কমিশনের ওপর বর্তায়। ফলে তারা এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ বা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তবে বর্তমান সরকার পূর্বের সেই অবস্থান থেকে সরে এসে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও জোট ইতোমধ্যে তাদের নিজস্ব প্রস্তাবনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এসব প্রস্তাবে বর্তমান গ্রেড কাঠামোর ১ম থেকে ৭ম গ্রেড পর্যন্ত অপরিবর্তিত রেখে নিচের গ্রেডগুলো পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষক নেতাদের মতে, এতে করে বেতন কাঠামো আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ১ম গ্রেডে শিক্ষকদের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্রতি বছর ২.৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া এবং ১ হাজার ৫০০ টাকা শিক্ষা ভাতা যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে ২য় থেকে ৭ম গ্রেড পর্যন্ত যথাক্রমে ১ লাখ ৪০ হাজার, ১ লাখ ২৫ হাজার, ১ লাখ ১০ হাজার, ৯৫ হাজার, ৮০ হাজার এবং ৭০ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নিম্ন গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রেও নতুনভাবে বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ম গ্রেডে ৬২ হাজার, ৯ম গ্রেডে ৫৫ হাজার, ১০ম গ্রেডে ৫০ হাজার, ১১তম গ্রেডে ৪৫ হাজার, ১২তম গ্রেডে ৪০ হাজার, ১৩তম গ্রেডে ৩৫ হাজার এবং ১৪তম গ্রেডে ৩০ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রস্তাবনায় শুধু মূল বেতনই নয়, বরং বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রেডে ভিন্ন ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে সার্বিকভাবে শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় এবং পেশাগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষক নেতাদের মতে, এই প্রস্তাবিত স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে দেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মরত লাখো শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। একইসঙ্গে শিক্ষকদের পেশাগত উৎসাহ ও মনোবল বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Leave a Reply