উৎসবে মানুষের হৃদয় যেন নতুন করে জেগে ওঠে, আর এর পূর্ণতা আসে নতুন পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে। ঈদের দিন বা অন্য কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে নতুন বস্ত্রের ছোঁয়া মানুষের মনে যোগ করে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস এবং উল্লাস। এই আনন্দ কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের নয়, বরং গভীর আধ্যাত্মিকতায় মজুত। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, নতুন পোশাক কেবল আত্মতৃপ্তির জন্য নয়—এটি আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের একটি বহিঃপ্রকাশ। যখন কোনো বান্দা নতুন কাপড় গায়ে দেয়, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত দোয়া পাঠ করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই শুকরিয়া তার ঐকান্তিক ইবাদতেরই অংশ, যা হৃদয়কে পবিত্র করে এবং গুনাহ মোচনের কারণ হয়ে ওঠে।
হজরত সাহাল ইবনে মুআজ ইবনে আনাস (রা.) তার বাবা হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো নতুন কাপড় পরার পর এই দোয়া পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।
দোয়া:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي هَذَا وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি কাসানি হাজা; ওয়া রাজাকানি-হি মিন গায়রি হাওলিম মিন্নি ওয়ালা কুওয়াতিন।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাকে এই কাপড় পরিয়েছেন এবং আমাকে এটি আমার কোনো প্রচেষ্টা বা শক্তির বাহুবলে দান করেছেন।
হাদিসের সূত্র: বুখারি (৩৬০-৩৬১/০১-০৪), আবু দাউদ (৪০২৩), বায়হাকি (৫৮৭২)।
এই দোয়ায় আমরা স্বীকার করি যে, সবকিছু আল্লাহর রিজিক—আমাদের ক্ষমতা ছাড়াই এসেছে। এটি পড়লে উৎসবের আনন্দের সাথে তাকওয়া যুক্ত হয়।
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নতুন কাপড় পরার সময় এই দোয়া পড়তেন। এটি পোশাকের মৌলিক উদ্দেশ্য—লজ্জাস্থান ঢাকা এবং জীবনকে সুন্দর করা—এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
দোয়া:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي، وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি কাসানি মা উয়ারি বিহি আওরাতি ওয়া আতাঝাম্মালু বিহি ফি হায়াতি।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে এমন কাপড় দিয়েছেন যা দিয়ে আমি আমার লজ্জাস্থান ঢেকে রাখি এবং জীবনে সৌন্দর্য লাভ করি।
হাদিসের সূত্র: তিরমিজি (৩৫৬০)।
এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পোশাকের প্রধান কাজ হলো পর্দা এবং শালীনতা, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নতুন কাপড় পরার সময় প্রথমে তার নাম উচ্চারণ করতেন—যেমন ‘জামা’, ‘পাগড়ি’ বা ‘চাদর’। তারপর এই দোয়া পড়তেন, যাতে পোশাকের ভালো-মন্দ দুই দিককেই আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা হয়।
দোয়া:
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيهِ أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ، وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু আনতা কাসাউতানিহি আসআলুকা মিন খাইরিহি ওয়া খাইরি মা সুনিআ লাহু ওয়া আউজুবিকা মিন শাররিহি ওয়া শাররি মা সুনিআ লাহু।
অর্থ: হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনার জন্য। আপনি আমাকে এই [নাম] পরিয়েছেন। আমি আপনার কাছে এর ভালো এবং এর জন্য যা তৈরি করা হয়েছে তার ভালো চাই। আর এর মন্দ এবং এর জন্য যা তৈরি করা হয়েছে তার মন্দ থেকে আপনার সন্মুখে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
হাদিসের সূত্র: তিরমিজি (১৭৬৭), আবু দাউদ (৪০২১), নাসাঈ (৩০৯), ইবনু হিব্বান (৫৪২১)।
এই দোয়া পোশাকের সম্ভাব্য ক্ষতি (যেমন অহংকার বা অন্যান্য অনিষ্ট) থেকে রক্ষা চায়, যা আমাদের জীবনকে আরও সচেতন করে তোলে।
ঈদ বা যেকোনো নতুন পোশাক পরার সময় এই দোয়াগুলো পড়ুন। প্রথম দোয়া দিয়ে শুরু করুন গুনাহ মোচনের জন্য, তারপর অন্য দুটি। এতে উৎসবের আনন্দের সাথে আল্লাহর স্মরণ অটুট থাকবে। মনে রাখবেন, পোশাকের সৌন্দর্য শালীনতা এবং শুকরিয়ায় নিহিত।
Leave a Reply