দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানিয়েছেন, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষা সংস্কারের কাজ তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে—তাৎক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি এবং মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে।
প্রথম ধাপ চলবে এখন থেকে ঈদুল ফিতর পর্যন্ত। এ সময়ে শিক্ষা খাতের বাজেট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর একটি ‘ডায়াগনস্টিক রিভিউ’ পরিচালনা করা হবে। উন্নয়ন বাজেটের ৫৩ শতাংশ ফেরত যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে রুট-কজ অ্যানালাইসিস করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের হাতে ট্যাব প্রদান, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ এবং ভাষা শিক্ষার জন্য পাইলট প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করা হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতা চিহ্নিত করা গেলে ভবিষ্যতে বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার শিক্ষার্থীদের শিখনফল উন্নত করতে সহায়ক হবে।
দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে ঈদুল ফিতরের পর। এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সম্মতি নিয়ে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে। এই রোডম্যাপ হবে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক, যেখানে থাকবে পরিমাপযোগ্য সূচক (Measurable Indicators) এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা। অর্থাৎ শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং কোন কাজ কতদিনে সম্পন্ন হবে এবং তার অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—সে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। এতে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তৃতীয় ধাপ হবে ১২ থেকে ৩৬ মাসের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন পর্যায়। এ ধাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায়। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘বড় টেকনিক্যাল রি-ফর্ম’ আনা হবে, যার মাধ্যমে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এখন ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment), প্রকল্পভিত্তিক কাজ, প্রেজেন্টেশন এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক পরীক্ষার দিকে ঝোঁক বাড়ছে। বাংলাদেশেও সে ধরনের আধুনিক মূল্যায়ন কাঠামো প্রবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
এছাড়া কারিগরি, সাধারণ ও মাদরাসা শিক্ষার মধ্যে ‘ব্রিজিং’ বা সেতুবন্ধ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এই তিন ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগে বৈষম্য দেখা যায়। সেতুবন্ধন কার্যকর হলে শিক্ষার্থীরা এক ধারার শিক্ষা থেকে অন্য ধারায় স্থানান্তর বা সমন্বিত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। এতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পথ আরও প্রশস্ত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন (Innovation) গ্র্যান্ট বাড়ানোর কথাও জানানো হয়েছে। গবেষণা তহবিল স্কেল-আপ করা হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও নীতিগত গবেষণায় বেশি সম্পৃক্ত হতে পারবেন। আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গবেষণা বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কাঠামোবদ্ধ ও সময়সীমাভিত্তিক সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক তদারকি। ঘোষিত রোডম্যাপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর। শিক্ষা খাতের এই সম্ভাব্য বড় পরিবর্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
Leave a Reply