আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নবম পে-স্কেলের সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে সরকারকে সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করেন, মোট ব্যয়ের পরিমাণ, রাজস্ব আহরণের বর্তমান অবস্থা এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি বিবেচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তুলনামূলকভাবে নিম্নস্তরে রয়েছে, ফলে রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী না করে বড় আকারের ব্যয় বৃদ্ধি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭-৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যেখানে আঞ্চলিক অনেক দেশে তা ১২-১৫ শতাংশের বেশি—এই ব্যবধান কমাতে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ—এসব বিষয়ও পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণপ্রাপ্তি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জনগণের মানসিকতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলেও তিনি মত দেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক খাত সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতি-নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অর্থনীতিকে টেকসই গতিতে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে গণতান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথাও তুলে ধরেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, ডিরেগুলেশন ও লিবারালাইজেশনের মাধ্যমে বাজারব্যবস্থাকে উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে কেবল ম্যানুফ্যাকচারিং নয়—খেলাধুলা, সংস্কৃতি, হস্তশিল্প, পর্যটনসহ বহুমাত্রিক খাত সমানভাবে বিকশিত হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বরিশালের শীতলপাটির কথা উল্লেখ করেন—যার বর্তমান বাজারমূল্য ৬০০-৭০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু কারিগরদের নকশা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার এবং রপ্তানি সহায়তা দেওয়া গেলে এই পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। বাস্তবে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে দেশীয় হস্তশিল্পের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে, যা দেখায় সঠিক সহায়তা পেলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম। সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হোক বা অর্থনৈতিক সংস্কার—সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সক্ষমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা, যাতে উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
Leave a Reply