বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক মুসলমান এবং স্বাধীনতার পর থেকে রমজান মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রথা রয়েছে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ ও ১৫২(১) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা তুলে ধরে রমজানে স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক দাবি করা হয়।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সারাদিন স্কুলে যাতায়াত ও ক্লাসের চাপে রোজা রাখতে কষ্টের সম্মুখীন হতে পারে। এতে ধর্মীয় চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি রমজানে স্কুল খোলা থাকলে নগর এলাকায় যানজট বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। সেই প্রত্যাশায় শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে রমজান মাসজুড়ে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে—এমন প্রত্যাশা অনেকের থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত বজায় রেখেছে। নিচে মূল কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের একাডেমিক ক্যালেন্ডার আগে থেকেই নির্ধারিত। রমজান মাসে পুরোপুরি ছুটি দিলে নির্ধারিত পাঠসম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ত। এখানে শিক্ষা সচিব যে বিষয়টি উল্লেখ করেছে তা হলো-রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষকদের আন্দোলন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বছরে নির্ধারিত ক্লাস ঠিকমত হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রমজানের প্রথমার্ধে (১৫ দিন) স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে এই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা যায়। বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির সিলেবাস শেষ করা এবং নির্ধারিত পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
রমজান মাসে স্কুল বন্ধ রাখার বিষয়ে পূর্বে দেওয়া নির্দেশনার ওপর আপিলের শুনানি শেষে উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ দেন। ফলে আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকেনি এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার পথ উন্মুক্ত হয়। যেহেতু এটা মহামান্য আদালতের রায় সেহেতু এর বিপক্ষে কিছু বলার থাকে না।
Secondary School Certificate (এসএসসি) ও অন্যান্য শ্রেণির বার্ষিক মূল্যায়ন সামনে রেখে পাঠদান চালু রাখা জরুরি বলে মনে করেছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ ছুটি দিলে পরীক্ষার্থীরা প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, পুরো মাস ছুটি দিলে শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে। তবে রোজাদার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কথা বিবেচনায় রেখে সময়সূচিতে কিছুটা নমনীয়তা আনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে—যেমন ক্লাসের সময় কমানো বা সকালে নেওয়া। তবে এ বিষয়ে এখনও তেমন কোন নির্দেশনা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাউশির নিকট থেকে আসেনি যেটা অতি দ্রতসময়ের মধ্যে আসা উচিত।
পুরো ছুটি না দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত সময়সূচিতে ক্লাস নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এতে ধর্মীয় অনুশাসন ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা—দুই দিকই সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উপরিউল্লিখিত কারণ ছাড়াও আরও কিছু অদৃশ্যমান কারণ রয়েছে বলে মনে করেন অধিকাংশ মাধ্যমিক বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীরা তা হলো- শিক্ষা প্রশাসনের সাথে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের একপ্রকার দুরুত্ব তৈরি হয়েছে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বাড়িভাড়া বৃদ্ধির আন্দোলনের সময় হতে। তখন শিক্ষা সচিবের কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে শিক্ষকদের মাঝে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল তা নিয়ে শিক্ষা সচিব বা শিক্ষা প্রশাসন এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের প্রতি অনেকটাই বিরক্ত। কারণ তখন একপ্রকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের এই ন্যায্য বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দাবী মানতে বাধ্য করা হয়। শিক্ষা প্রশাসন কোনভাবেই এই দাবী মানতে চাইছিল না।
এছাড়া আরও যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের বিভিন্ন সময়ে এই রমজানের ছুটিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত কথনও শিক্ষা প্রশাসন খুব একটা ভালভাবে গ্রহণ করেনি। তারা এখানে তাদের ইগো সমস্যাকে প্রাধ্যান্য দিয়েছে। কারণ তারা প্রত্যেকবারই এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট তাদের এই নৈতিক পরাজয় ভালভাবে মেনে নিতে পারেনি।
এখন এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করেছে হলো ছুটির পক্ষে রিট আবেদন করা। প্রশ্ন হলো এই রিট করল কার ইন্ধনে এটি কি শিক্ষক বা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে নাকি শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম সর্তকতা হিসাবে এই রিট করানো যাতে এই অপশনটুকু শিক্ষক অভিভাবকরা ব্যবহার করতে না পারে। আমার যা মনে হয় তা হলো এখানে ২য় আশঙ্কাটাই অধিকতর বেশি সত্য। আর প্রথম কারণটা যদি সত্যি হয় তাহলে শিক্ষকরা তাদের নিজেদের কৌশলে নিজেরাই পরাজিত হয়েছে।
রমজানে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল একাডেমিক ক্যালেন্ডার, আসন্ন পরীক্ষা, আদালতের স্থগিতাদেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান। তবে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘবে সময়সূচিতে নমনীয়তা আনার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
Leave a Reply