দেশের নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত সিদ্ধান্তে নতুন মোড় এসেছে। পুরো রমজান মাস স্কুল বন্ধ রাখার যে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট, তা স্থগিত হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক পাঠদান অব্যাহত থাকবে। ফলে আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলবে এবং ৮ মার্চ থেকে শুরু হবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি। শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তে শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে এবং পূর্বনির্ধারিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে। রমজান মাসে ক্লাস চলবে কি না—এই প্রশ্নে কয়েকদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছিল। এর আগে এক রিট মামলার শুনানি শেষে হাইকোর্ট পুরো রোজার মাস স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সেই নির্দেশনা স্থগিত হওয়ায় এখন নিয়মিত ক্লাস চালু থাকছে।
রমজান ও শিক্ষা কার্যক্রম—দুটি বিষয়ই আমাদের সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ধর্মীয় অনুভূতি, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়সূচি কিছুটা সমন্বয় করে (যেমন—ক্লাসের সময় কমানো, অতিরিক্ত গরমে বিরতি বাড়ানো, পরীক্ষার তারিখ সামঞ্জস্য করা) রমজান মাসেও কার্যকরভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। ইতোমধ্যে অনেক বিদ্যালয় সংক্ষিপ্ত রুটিন ও সকালভিত্তিক ক্লাসের পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা, বার্ষিক পরীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সঠিক সময়ে শেষ করা—এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট ও শিবরাত্রী ব্রত উপলক্ষে টানা পাঁচ দিন ছুটি ছিল। ফলে অতিরিক্ত ছুটি দিলে পাঠ্যসূচিতে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।
শিক্ষাবিদদের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষাবর্ষে নানা কারণে প্রায়ই ছুটি যুক্ত হয়—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নির্বাচন, বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি। তাই দীর্ঘমেয়াদি ছুটি দিলে শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতে ৮ মার্চ থেকে ঈদের ছুটি শুরু হলেও মাদ্রাসাগুলোতে নির্বাচনী ছুটির মধ্য দিয়েই ঈদের ছুটি কার্যত শুরু হয়েছে। মাদ্রাসার বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ২৮ মার্চ পর্যন্ত ছুটি চলবে। অন্যদিকে কলেজগুলোতে বুধবার থেকে ঈদের ছুটি শুরু হয়ে ২৯ মার্চ থেকে পুনরায় ক্লাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এই ভিন্নতা মূলত আলাদা বর্ষপঞ্জি ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ছুটির সময়সূচি কিছুটা আলাদা হয়ে থাকে।
রমজান মাসে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় কয়েকটি গঠনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—
অভিভাবকদেরও এ সময় সন্তানের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাড়তি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সেহরি ও ইফতারের সময়সূচির সঙ্গে মিল রেখে পড়ার সময় নির্ধারণ করলে শিক্ষার্থীরা ক্লান্তি কম অনুভব করবে।
রমজান মাসে স্কুল খোলা বা বন্ধ রাখা—এই বিতর্ক নতুন নয়। প্রতিবছরই বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে অনিশ্চয়তা কমবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্মীয় অনুশাসন ও একাডেমিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সর্বোত্তম পথ।
সব মিলিয়ে, হাইকোর্টের আগের নির্দেশনা স্থগিত হওয়ায় আপাতত বিদ্যালয়গুলোতে স্বাভাবিক পাঠদান চলবে এবং ৮ মার্চ থেকে শুরু হবে ঈদের ছুটি। এখন সবার প্রত্যাশা—সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাবর্ষ সফলভাবে সম্পন্ন হোক এবং শিক্ষার্থীরা রমজানের পবিত্রতা ও শিক্ষাজীবনের দায়িত্ব—দুটিই সমানভাবে পালন করতে সক্ষম হোক।
Leave a Reply