বাংলাদেশে রমজান মাস এলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটির একটি ঐতিহ্যগত ধারা পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে রমজানের পুরো সময় বা অধিকাংশ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রথা চালু রয়েছে। পরবর্তীতে সেই ছুটি বার্ষিক ছুটির ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। ফলে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে চলতি বছর রমজান ছুটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, মাদ্রাসা ও কলেজ রমজান মাসে পূর্ণাঙ্গ ছুটি বহাল থাকলেও মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রায় ১৭ বা ১৮ রমজান পর্যন্ত খোলা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এতে শিক্ষক-অভিভাবক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, যার মধ্যে জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট উল্লেখযোগ্য, বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাদের যুক্তি হলো, রমজান মাসে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, যানজট, গরম আবহাওয়া ও পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশ বিবেচনায় আংশিক খোলা রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। মাউশি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষকদের আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ফলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে এখন এক ধরনের অপেক্ষার পরিবেশ বিরাজ করছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হয়। ভারতে রমজান মাসে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সচরাচর বন্ধ থাকে না; তবে মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য বা অঞ্চলে পরীক্ষার সময়সূচি ও ক্লাসের সময় সামান্য সমন্বয় করা হয়। পাকিস্তানে রমজান মাসে স্কুল-কলেজ খোলা থাকলেও সময়সূচি কমিয়ে আনা হয়—সাধারণত সকাল বেলায় সংক্ষিপ্ত সময়ের ক্লাস নেওয়া হয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও পূর্ণ ছুটির পরিবর্তে ক্লাসের সময় কমানো, সহশিক্ষা কার্যক্রম সীমিত রাখা এবং পরীক্ষার তারিখ পুনর্নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ দেখা যায়। অর্থাৎ অধিকাংশ মুসলিমপ্রধান দেশেই রমজান উপলক্ষে সময়সূচিতে নমনীয়তা আনা হয়, তবে পুরো মাসজুড়ে বন্ধ রাখার নজির তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি কেবল ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে শিক্ষাবর্ষের সিলেবাস সম্পন্ন করার চাপ, অন্যদিকে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক স্বস্তির বিষয়—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সমন্বিত ও বৈষম্যহীন সিদ্ধান্ত—যেখানে মাদ্রাসা, কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরের জন্য সমতাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করা হবে—তা হলে বিভ্রান্তি কমবে। প্রয়োজনে পূর্ণ ছুটির বদলে সময় কমিয়ে ক্লাস, অনলাইন সহায়ক পাঠদান, অথবা রমজান-পরবর্তী অতিরিক্ত ক্লাসের মতো বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ নাগরিক মুসলমান। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে— এটিই আইন, প্রথা ও নীতি এবং ওইভাবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রমজান মাসে বন্ধ থাকে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন ছাড়া কিছুই করা যাবে না, অনুচ্ছেদ ১৫২(১) অনুযায়ী আইন অর্থ বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতা সম্পন্ন যেকোনো প্রথা ও রীতি। তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় রমজান মাসে খোলা রাখার সরকারের তর্কিত সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক।
সর্বোপরি, রমজান ছুটি নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বাস্তবতা, শিক্ষা-মান এবং ধর্মীয় অনুভূতির সমন্বয়ে। একটি সুস্পষ্ট, আগাম ঘোষিত ও সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য নীতিমালা প্রণয়ন করলে প্রতিবছর এ ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হবে। এখন সবার দৃষ্টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আসন্ন সিদ্ধান্তের দিকে—যা হয়তো ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী দিকনির্দেশনা তৈরি করবে।
Leave a Reply