অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন সরকারি চাকরিজীবীরা। লাগাতার কর্মসূচি, মানববন্ধন ও স্মারকলিপির পর সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর। সর্বশেষ একটি কমিটি গঠন করা হলেও নির্বাচনের আগেই বাস্তব ফল দেখতে চেয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসছে। ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে এখন নতুন কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের জোট।
সরকারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মূখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী জানিয়েছেন, তারা নতুন সরকার প্রধান ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি সরাসরি উপস্থাপন করবেন। এর আগে তার নেতৃত্বে সংগঠনের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের দফতরে লিখিত আবেদনও দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের দাবি, সচিবালয়ের বাইরে বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই জোটের সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীসহ প্রায় ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী সম্পৃক্ত।
চাকরিজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পে-স্কেল প্রণয়নের সময় থেকেই নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ১১ থেকে ২০ গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা বর্তমান বাজারদর, ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে চরম আর্থিক চাপে আছেন। তাদের ভাষায়, “প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করলেও ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।”
বিশেষ করে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলক কম হওয়ায় মূল্যস্ফীতির ধাক্কা তাদের ওপর বেশি পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও বাসাভাড়া-চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বাড়ায় বাস্তব আয় কমে গেছে। ফলে তারা মনে করছেন, নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পুরনো কাঠামো টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
চাকরিজীবীদের ৭ দফা দাবির মূল বিষয়গুলো হলো—
১:৪ অনুপাতে ১২ ধাপে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে বৈষম্যহীন নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন। যাদের মূলবেতন সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছেছে, তাদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা।
২০১৫ সালের গেজেটে প্রত্যাহারকৃত ৩টি টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল, বেতন জ্যেষ্ঠতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে গ্রাচ্যুইটির পাশাপাশি পেনশন চালু।
বর্তমান ৯০ শতাংশের পরিবর্তে গ্রাচ্যুইটি শতভাগ নির্ধারণ এবং পেনশন গ্রাচ্যুইটির হার ১ টাকার সমান ৫০০ টাকা নির্ধারণ।
ব্লক পোস্টসহ সব পদে কর্মরতদের ৫ বছর পরপর উচ্চতর গ্রেড বা পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা। অধঃস্তন আদালতের কর্মচারীদের বিচার বিভাগীয় কর্মচারী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান এবং টেকনিক্যাল কাজে নিয়োজিতদের টেকনিক্যাল মর্যাদা দেওয়া।
অনেক কর্মচারীর স্কেল সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছানোর কারণে ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এ অবস্থায় নিয়মিত বার্ষিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখার দাবি।
মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সব ভাতা পুনর্নির্ধারণ এবং কর্মচারীদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু।
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর এবং অবসরের বয়স ৬২ বছর নির্ধারণ। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদধারীদের চাকরিকাল গণনায় বৈষম্যমূলক অর্থ মন্ত্রণালয়ের আদেশ বাতিল।
নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে এই দাবিগুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সরকারি চাকরিজীবীরা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যারা মাঠপর্যায়ে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করেন। তাদের সন্তুষ্টি বা অসন্তোষ সরাসরি প্রশাসনিক কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
একদিকে সরকারকে রাজস্ব সক্ষমতা, বাজেট ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক শর্ত বিবেচনা করতে হবে; অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক বাস্তবতা মোকাবিলায় কর্মচারীদের জীবনমান রক্ষা করাও জরুরি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আকারে বেতন কাঠামো পরিবর্তন করলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। তাই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে বা আংশিকভাবে শুরু হতে পারে।
সরকারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ আশা করছে, নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণা হবে। তারা সরাসরি সাক্ষাৎ করে দাবি উপস্থাপনের তারিখ ও সময় চেয়েছেন। যদি সরকার ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে আলোচনার টেবিলে সমাধান আসতে পারে; অন্যথায় আন্দোলন আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেল ইস্যু এখন নতুন সরকারের জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের ২২ লাখ কর্মচারীর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে এই দাবির ভবিষ্যৎ।
Leave a Reply