নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে বর্তমানে সরকারি অঙ্গনে এক ধরনের ডামাডোল ও অপেক্ষার পরিবেশ বিরাজ করছে। এখন সবার দৃষ্টি মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশের দিকে। প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:৮। এতে সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া জাতীয় পে কমিশনের প্রতিবেদনে এই সুপারিশই উপস্থাপন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে অষ্টম পে কমিশনের অভিজ্ঞতা এবং তখনকার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিষয়গুলো আবারও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে, তা হলো—কবে গেজেট প্রকাশিত হবে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে, অষ্টম জাতীয় পে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কতদিনের মধ্যে সেই পে স্কেলের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের সুপারিশ প্রতিবেদন ২০১৫ সালের ১৩ মে সরকারের কাছে জমা দেয় পে কমিশন। এর পর প্রায় ৭ মাস ২০ দিন সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশ দেরিতে হলেও পে স্কেল কার্যকর ধরা হয়েছিল তার আগেই, অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে। ফলে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রায় দেড় মাস পর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পেতে শুরু করেন। ওই সময়ে কয়েক মাসের বকেয়া বেতন ‘এরিয়া বিল’ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছিল।
নবম পে স্কেলের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, সুপারিশ প্রণয়ন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তবে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গেজেট প্রকাশ। কারণ গেজেট ছাড়া পে কমিশনের কোনো সুপারিশেরই বাস্তব মূল্য থাকে না। বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। সে কারণে যত দ্রুত সম্ভব পে স্কেল কার্যকরের নির্দিষ্ট মাস ঘোষণা এবং গেজেট প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এই বিষয়টিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বিষয়ে এর আগে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। আর পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। তিনি আরও জানান, পে কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করার জন্য আরও কয়েকটি কমিটি কাজ করবে, যার কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগতে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রতিবেদন জমা দেওয়াকেই একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করছে।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের মুখপাত্র ও কর্মচারী নেতা আব্দুল মালেক বলেন, যে প্রস্তাবই দেওয়া হয়েছে, সেটিকে তারা সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের কাছে তাদের স্পষ্ট দাবি হলো—৩১ জানুয়ারির মধ্যেই যেন পে স্কেলটি গেজেট আকারে জারি করা হয়। কোনো কারণে যদি নির্বাচনের আগে এই গেজেট প্রকাশ না হয়, তাহলে এই প্রস্তাব কিংবা পে কমিশন—কোনোটিরই আর বাস্তব কোনো গুরুত্ব বা কার্যকারিতা থাকবে না। কারণ নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে এই প্রস্তাব পরিবর্তন করতে পারে এবং বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি ৩ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখতে পারে।
পে স্কেল বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ বিরতির পর নতুন পে স্কেল প্রণয়ন নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে গত চার বছর ধরে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, সেই বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত অনেকটাই প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে।
তবে তিনি বলেন, সাপ্লাই সাইড থেকে—অর্থাৎ সরকারের আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। সরকারের সেই সক্ষমতা আদৌ আছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, সেটিকে কীভাবে সংকলন ও বাস্তবায়ন করবে, সেটাই এখন মূল আলোচনার বিষয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেমন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে, তেমনি আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
পে স্কেল বাস্তবায়নের নেপথ্যের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে অধ্যাপক শাহাদাত বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল রাজস্ব আহরণে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যাবে। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, যেখানে দেশের প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষের কর নেটের আওতায় থাকার কথা, সেখানে নিয়মিত করদাতা মাত্র প্রায় ৩০ লাখ। এই জায়গায় সরকার যদি কর নেট সম্প্রসারণ করে তিন কোটিতে উন্নীত করতে পারত, তাহলে রাজস্ব আহরণে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারত।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে কর রাজস্ব বাড়াতে ব্যর্থ হয়—এমনকি ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও যদি একইভাবে ব্যর্থ হয়—তাহলে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথমত, টাকা ছাপানো, যা কার্যত রাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা কিংবা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করা। এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও থেকে যায়। কারণ পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে, এতে চাহিদা বাড়বে। কিন্তু সেই অনুপাতে যদি পণ্যের যোগান না বাড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাবে। এই চাহিদা-সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও সরকারকে ভবিষ্যতে মোকাবিলা করতে হবে।
আবারও বক্তব্যে ফিরে এসে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের মুখপাত্র আব্দুল মালেক বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেহেতু এই পে স্কেল প্রণয়ন করেছে, তাই এর স্বার্থকতা গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হওয়া উচিত। প্রধান উপদেষ্টা যদি এই গেজেট প্রকাশ করেন, তাহলে সেটি একটি ইতিহাস হয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশাও তারা ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, পে স্কেলের সুপারিশ দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ। তবে কিছু হতাশা যে নেই, তা নয়। কারণ তাদের সর্বনিম্ন বেতনের দাবি ছিল ৩৫ হাজার টাকা, যা এই প্রস্তাবে প্রতিফলিত হয়নি। এছাড়া ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের মধ্যে বেতনের ব্যবধান যেখানে ১৩ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত, সেখানে ১৯তম ও ২০তম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ বাজারদর সবার জন্য সমান। তাই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা যেন বাজারে গিয়ে হিমশিম না খান—এটাই ছিল তাদের মূল প্রত্যাশা। এ কারণেই তারা আবারও অবিলম্বে পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অষ্টম পে স্কেলের মতো এবারও গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার যেন প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা হয় এবং বাস্তবায়নে অযথা বিলম্ব না হয়। সে জন্যই তারা দ্রুত প্রজ্ঞাপন তথা গেজেট প্রকাশের জোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
Leave a Reply