বাংলাদেশের প্রায় সব পেশাজীবী শ্রেণির জীবনমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু না কিছু উন্নতির মুখ দেখলেও ব্যতিক্রম হিসেবে রয়ে গেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। রাষ্ট্রের মানবসম্পদ গঠনে যাঁরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের ভাগ্যোন্নয়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি আজও হতাশাজনক। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা যখন নিজেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা অনিয়ম, বৈষম্য ও ভোগান্তির কথা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই জবাবে শুনতে হয়, “আপনারা তো এমপিওভুক্ত, আপনাদের বিষয়গুলো এমনই চলবে।” এই মানসিকতাই প্রমাণ করে যে সমস্যাটি কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিগতও।
এক বছর আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ইএফটি (EFT) পদ্ধতিতে প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ভোগান্তি কমানোর আশ্বাস দিয়ে। বলা হয়েছিল, এনালগ বা হাতে-কলমে ব্যবস্থার যুগ শেষ হবে, বিলম্ব থাকবে না, মাসের ১ থেকে ৩ তারিখের মধ্যেই বেতন পৌঁছে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ইএফটি যুগে প্রবেশ করেও বেতন প্রদানের ভোগান্তি প্রায় আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। প্রযুক্তি বদলালেও ব্যবস্থাপনার জটিলতা ও গড়িমসি বদলায়নি।
এনালগ সিস্টেমে বেতন প্রদানের সময় নানা অজুহাতে বিলম্ব হতো, যা কষ্ট হলেও শিক্ষক-কর্মচারীরা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যখন ইএফটির মতো আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু হয়েছে, তখনও যদি একই ধরনের বিলম্ব হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সমস্যা আসলে কোথায়? প্রযুক্তিতে, নাকি প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে? ইএফটি চালুর প্রথম মাসেই যে চরম ভোগান্তির মুখে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা পড়েছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, এটি সাময়িক; ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাস বাস্তবে রূপ নেয়নি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যায় মাউশির ইএমআইএস সেলের প্রোগ্রামার মো. জহির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আজ রবিবার ২৫ জানুয়ারি থেকে জানুয়ারি ২০২৬ মাসের বেতন বিল সাবমিট করা যাবে। সেই তথ্যমতে আজ রবিবার হতে জানুয়ারী মাসের এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ইএফটি ড্যাশবোর্ডে বিল সাবমিট অপশন সক্রিয় করা হয়েছে। আগামী তিনদিনের মধ্যে সকল এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে এই সময়ের মধ্যে তাদের জানুয়ারী মাসের বেতন বিল সাবমিট করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ মাসের প্রায় শেষ প্রান্তে গিয়েও বেতন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অপেক্ষা—যা শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসে ১৯ হাজার ৮২৫টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (এর মধ্যে স্কুল ১৭ হাজার ২০৩টি এবং কলেজ ২ হাজার ৬২২টি) মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৯ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। ডিসেম্বর মাসে প্রথম ধাপে স্কুলের ৩ লাখ ১২২২ জন এবং কলেজের ৮৮ হাজার ৩৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী বেতন পেয়েছেন। এই বেতনের মধ্যে ছিল মূল বেতন, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও বিশেষ সুবিধা। এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর বেতন ব্যবস্থাপনা যদি নিয়মিত ও সময়মতো নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সেটি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।
পরিশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রতিমাসে এই নানাবিধ জটিলতা আর কতদিন চলবে? রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশাজীবী শ্রেণিকে এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে কি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যাশা করা যায়? এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদান কোনো দয়া নয়, এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবায়নে আর কত আশ্বাস, আর কত অপেক্ষা—এই প্রশ্নের জবাব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
Leave a Reply