বেসরকারি স্কুল-কলেজ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য পরীক্ষার নম্বর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব পদে নিয়োগ পরীক্ষা সর্বমোট ৬০ নম্বরের মধ্যে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ছয়টি পৃথক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই পরীক্ষা আয়োজনের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে প্রার্থীদের প্রশাসনিক দক্ষতা, একাডেমিক যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণ আরও সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা যায়। আগামীকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠেয় এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এ প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানা গেছে, জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে উক্ত সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন। এছাড়াও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মো. মিজানুর রহমান, তিনটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয় এবং এনটিআরসিএর সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কর্মশালায় অংশ নেবেন। সভায় আলোচনার মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষার কাঠামো, বিষয় নির্বাচন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) একটি সূত্র জানিয়েছে যে, প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ বিধিতে মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ১০০ নম্বরের মধ্যে ৬০ নম্বর থাকবে লিখিত বা এমসিকিউ পদ্ধতির পরীক্ষার জন্য এবং বাকি ৪০ নম্বর রাখা হবে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) ওপর ভিত্তি করে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ৪০ নম্বরের মধ্যে ভাইভার জন্য ২০ এবং প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের ভিত্তিতে আরও ২০ নম্বর বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, লিখিত/এমসিকিউ পরীক্ষার পাশাপাশি প্রার্থীর সার্বিক যোগ্যতা ও মৌখিক দক্ষতাও এই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, ৬০ নম্বরের লিখিত বা এমসিকিউ পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান এবং দৈনন্দিন বিজ্ঞানের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত দুটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো আর্থিক বিধিবিধান এবং অন্যটি প্রশাসনিক নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়। সব মিলিয়ে মোট সাতটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব বিষয়ের তালিকা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য সংশ্লিষ্ট সভায় অনুমোদিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র ধারণা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনটিআরসিএর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের জন্য আর্থিক বিধি-বিধান সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। এসব বিধি সম্পর্কে ধারণা না থাকলে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। একইভাবে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রশাসনিক দায়িত্ব ও নীতি–নিয়ম সম্পর্কে ধারণা থাকাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক বিধিবিধান ও প্রশাসনিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট খসড়া বিধিতেও বিষয়গুলো এভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এনটিআরসিএ যে খসড়া মূল্যায়নপদ্ধতি প্রস্তুত করেছে, তা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি আছে কি না, কিংবা প্রয়োজন হলে কোনো বিষয় সংযোজন বা বিয়োজন করা উচিত কি না—এসব বিষয়ে মতামত সংগ্রহের জন্য আগামীকাল একটি কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। স্টেকহোল্ডারসহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালায় অংশ নেবেন। তিনি বলেন, কর্মশালা শেষে আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং তখন এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানানো সম্ভব হবে।
প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ সংক্রান্ত খসড়ায় আরও যা আছে
খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপারিনটেনডেন্ট ও সহকারী সুপারিনটেনডেন্টসহ প্রধান পদে নিয়োগের সুপারিশ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসি)। সর্বশেষ জারিকৃত এমপিও নীতিমালার বিধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শূন্য পদের চাহিদাপত্র অনলাইনের মাধ্যমে এনটিআরসির কাছে প্রেরণ করতে হবে। পরবর্তী ধাপে এসব চাহিদা যাচাই-বাছাই করে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নিয়োগপ্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক—উভয় ধরণের পরীক্ষা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের বণ্টন, প্রশ্ন কাঠামো এবং পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করবে এনটিআরসি নিজেই। প্রার্থীদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন করা বাধ্যতামূলক থাকবে। লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি শূন্য পদে তিন গুণ সংখ্যক প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ডাকা হবে।
পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত মোট নম্বরের সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে। সেই মেধাক্রম অনুসারে শূন্য পদের সমসংখ্যক প্রার্থীর একটি প্যানেল তালিকা তৈরি করা হবে। খসড়া বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরীক্ষার ফলাফল, কৃতকার্যতা ও চূড়ান্ত প্যানেল তালিকা প্রণয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে এনটিআরসির সিদ্ধান্তই হবে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
Leave a Reply