নির্বাচনী সময়কে ঘিরে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ না করার যে নির্দেশনা জারি হয়েছে, তা নির্বাচনী আচরণবিধি ও চাকুরি বিধির আলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি যদি কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন, তবে তা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—এ ধরনের অংশগ্রহণকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বাস্তবতার নিরিখে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবস্থানটি একটি বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। তারা সম্পূর্ণ সরকারি কর্মচারী নন, আবার পুরোপুরি বেসরকারি খাতেও পড়েন না—এ রকম এক মধ্যবর্তী কাঠামোয় কাজ করেন। এ কারণে তাদের সামাজিক ও পেশাগত দায়বদ্ধতার পরিধিও তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। স্থানীয় সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থানকারী এই শিক্ষকরা প্রায়ই গ্রাম-মহল্লা, সংগঠন, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা স্থানীয় উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কাজে অংশ নেন। ফলে নির্বাচনের আগে-পরে রাজনৈতিক পরিবেশে তারা নানা দ্বিধা-সংকট, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সামাজিক চাপে পড়তে পারেন—এটিও একটি বাস্তবতা। কারণ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের সমাজে অনেক বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করেই প্রতিষ্ঠান ও নিজের পরিবারের প্রতি দায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেখানে সরকারের এই জারিকৃত বিধানের মাধ্যমে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সাধারণত তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেন—শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বা স্থানীয় সমস্যা সমাধানের মতো নানা বিষয়েই তাদের উপস্থিতি থাকে। কিন্তু নির্বাচনী সময়ে এই সমস্ত সামাজিক সম্পৃক্ততা অনেক সময় ‘নির্বাচনী কার্যক্রম’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে একদিকে তারা সরকারি নির্দেশনা মানতে বাধ্য, অন্যদিকে স্থানীয় সম্পর্ক-সমীকরণ বজায় রাখাও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এতে শিক্ষক-সমাজ যে মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে, তা নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় আনা জরুরি।
এ কারণে বিষয়টি কেবল নির্দেশনা জারি করে শেষ করা নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত সমাধান কাঠামো প্রয়োজন। যেমন—কোনটি সামাজিক দায়িত্ব পালন, আর কোনটি সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণা—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট গাইডলাইন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এমপিওভুক্ত শিক্ষা-কর্মীদের জন্য সচেতনতা সভা, ব্যাখ্যামূলক চিঠি, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়ক ভূমিকা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সহজ ব্যবস্থা থাকলে অযৌক্তিক জটিলতা কমবে। শিক্ষকদের প্রতি সামাজিক সম্মান ও পেশাগত মর্যাদাকে বিবেচনায় রেখে নীতিমালায় সংবেদনশীলতা ও বাস্তববোধ যুক্ত করা অত্যাবশ্যক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিক্ষক সমাজ দেশের জ্ঞানচর্চা ও মূল্যবোধ রক্ষার প্রধান ভরসা। তাদের ওপর অযৌক্তিক চাপ বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষা-পরিবেশের ওপরও। তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পাশাপাশি, তাদের সামাজিক ভূমিকা ও কর্মপরিবেশকে সম্মান জানিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণই হবে সবচেয়ে গঠনমূলক পথ।
অতএব, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি অনুরোধ—সরকারি নির্দেশনা মেনে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকুন, এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সচেতন ও সতর্ক থাকুন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিও প্রত্যাশা—নীতির প্রয়োগে সংবেদনশীলতা ও বাস্তবতা-বোঝাপড়া যেন সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।

Leave a Reply