নবম জাতীয় পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্তকরণকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে পে-কমিশনের কার্যক্রমে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে রাষ্ট্রীয় শোক ও সরকারি ছুটি ঘোষণার প্রেক্ষাপটে স্থগিত হয় কমিশনের নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ সভা। এই সভাটিই ছিল সুপারিশ চূড়ান্ত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু সভার নতুন তারিখ এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি কমিশন। ফলে পূর্বনির্ধারিত ডেডলাইনের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়া সম্ভব হবে কি না— তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কমিশনের একজন কর্মকর্তা শনিবার বিকেলে জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুতে স্থগিত হওয়া পূর্ণ কমিশনের সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে কেবল একটি সভা দিয়েই সুপারিশ চূড়ান্ত করা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, কমিশনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনো অমীমাংসিত; এসব বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে পূর্ণ ঐক্যমত নিশ্চিত করতে অন্তত আরও দুটি সভা করা প্রয়োজন। সে কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া “কঠিন হয়ে পড়তে পারে” বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে কমিশন ইতোমধ্যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের সুপারিশ জমা দেওয়ার সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে আগামী মধ্য জানুয়ারিকে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত তারিখ নয়— বরং সম্ভাব্য সময়সূচি। কমিশন সূত্র জানায়, নতুন পে-স্কেলের কাঠামোতে গ্রেড সংখ্যা কত হবে, বেতন ব্যান্ড কীভাবে বিন্যস্ত হবে, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন কতটুকু বাড়ানো হবে, ভাতার ধরন ও হার কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে— এসব বিষয়ে এখনো ঐক্যমত্যে পৌঁছানো যায়নি।
নবম পে-স্কেলের প্রস্তাব প্রণয়নের ক্ষেত্রে কমিশন মূলত তিনটি স্তরে কাজ করছে—
১) মাঠপর্যায়ের দপ্তর, সংস্থা ও সংগঠন থেকে মতামত সংগ্রহ
২) সংগৃহীত প্রস্তাব বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক মূল্যায়ন
৩) অভ্যন্তরীণ নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে সুপারিশ চূড়ান্তকরণ
তবে এখনো সম্পূর্ণ প্রতিবেদন রচনা শুরু করা যায়নি; কারণ, কাঠামোগত অনেক সিদ্ধান্তই এখন আলোচনাধীন।
কমিশনের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মধ্য জানুয়ারির মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে কমিশন নির্ধারিত সময়ের আগেও রিপোর্ট জমা দিতে পারে, তবে পূর্ণ কমিশনের আরও অন্তত একটি ফলপ্রসূ সভা না হলে নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ ঘোষণা করা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, “অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে সবার সম্মতি ছাড়া রিপোর্ট জমা দিলে সেটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে।”
বেতন গ্রেড সংখ্যা নিয়ে কমিশনের ভেতর বেশ বড় ধরনের মতপার্থক্য বিদ্যমান। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রচলিত গ্রেড সংখ্যা ২০টি। কমিশনের একাংশ মনে করেন, বিদ্যমান গ্রেড কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে কেবল যৌক্তিক হারে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করাই বাস্তবসম্মত হবে। তাদের যুক্তি— গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলে প্রশাসনিক কাঠামোয় অস্থিরতা কম হবে এবং পদোন্নতি ও পদমর্যাদার ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে।
অন্যদিকে আরেকটি অংশ গ্রেড সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে ১৬-তে আনার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই গ্রেড কাঠামো বহাল থাকায় অনেক জায়গায় একই ধরনের পদে ভিন্ন গ্রেডের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। গ্রেড সংকোচন করলে বৈষম্য কমবে এবং বেতন কাঠামো আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে।
তবে তৃতীয় একটি অংশ আরও এগিয়ে গ্রেড সংখ্যা ১৪-তে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের অভিমত— অনেক বেশি গ্রেড থাকার কারণে কর্মচারীদের মধ্যে আয়ের দূরত্ব ও স্তরভিত্তিক বিভাজন বেড়ে যায়। গ্রেড কমানো হলে একই ধরনের কাজের জন্য আয়ের পার্থক্য কমে আসবে এবং বেতন সিঁড়িটি তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক হবে।
অন্যদিকে রিপোর্ট প্রণয়নের ক্ষেত্রে পে-কমিশন “তাড়াহুড়ো নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও টেকসই সুপারিশ” তৈরির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন সংস্থা, দপ্তর ও কর্মচারী সংগঠন থেকে পাওয়া মতামতগুলো খাতভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে নথিবদ্ধ করা হচ্ছে। কমিশন সদস্যদের মতে, যে কোনো পে-স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়— বরং অর্থনীতি, বাজেট, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মবাজার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই সুপারিশের বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে— পূর্ণ কমিশনের স্থগিত সভা, অভ্যন্তরীণ মতভেদ এবং আলোচনাধীন নীতিগত বিষয়গুলো— নবম জাতীয় পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার সময়সূচিকে আরও কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারে বলে প্রশাসনিক মহল মনে করছে। তবে কমিশন আশাবাদী— অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে ঐক্যমত্যে পৌঁছানো গেলে নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে হলেও সুপারিশ জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
Leave a Reply