বেসরকারি স্কুল ও কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নভেম্বর মাসের বেতন-ভাতার প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে দেশের প্রায় পৌনে চার লাখ শিক্ষক-কর্মচারী চলতি মাসের সরকারি অংশের বেতন পেতে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানিয়েছে যে, অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এসব শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) মাধ্যমে টাকা পৌঁছে যাবে। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বেতন-ভাতা প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে।
তথ্য অনুযায়ী, এই ধাপে মোট ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭০ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী বেতন-ভাতা পাবেন। এর মধ্যে স্কুল পর্যায়ে রয়েছেন ২ লাখ ৯৭ হাজার ২৬২ জন এবং কলেজ পর্যায়ে রয়েছেন ৮৭ হাজার ৮০৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী। দেশে মোট ১৯ হাজার ৮৫৬টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিও সুবিধাভোগী কর্মরত আছেন। এর মধ্যে ১৭ হাজার ২০৩টি স্কুল এবং ২ হাজার ৬২৬টি কলেজ রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য ইএমআইএস সেলের ডেটাবেইসে আপডেট থাকা সাপেক্ষেই বেতন-ভাতার হিসাব তৈরি করা হয়।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নভেম্বর মাসের বেতন-ভাতার হিসাব প্রস্তুতে মোট ১ হাজার ৪৬ কোটি ৯৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩২২ টাকা অনুমোদিত হয়েছে, যা ইএমআইএস সেলের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে। এই অর্থের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা এবং বিশেষ সুবিধা বাবদ নির্ধারিত পরিমাণ। প্রতিমাসেই ইএমআইএস সেল সব তথ্য যাচাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় এবং অনুমোদন পাওয়ার পরই ইএফটির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কাজটি সম্পন্ন হয়।
এর আগে নভেম্বর মাসের এমপিও বিল অনলাইনে জমা দেওয়ার জন্য ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানই ইএমআইএস সেলে বেতন-ভাতার তথ্য জমা দেবেন এবং সরকারী অংশ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের জমাকৃত তথ্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। ফলে বেতন-ভাতার তথ্য সঠিক ও নির্ভুলভাবে জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বেসরকারি স্কুল-কলেজের পৌনে চার লাখেরও বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর নভেম্বর মাসের বেতনের সরকারি আদেশ (জিও) জারি হলেও বেতন পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে জিও প্রকাশের পর সাধারণত দ্রুতই চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানো হয়, যাতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবগুলোতে টাকা পৌঁছে দেওয়া যায়। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে পর্যন্ত চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসে বেতন সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়, তবে আজ রাতের মধ্যেই তথ্য পাঠানো হতে পারে এবং পরে আগামীকাল বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নভেম্বর মাসের বেতন জমা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) মাউশির এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইএমআইএস) সেল সূত্র জানিয়েছে, বেতন পাঠানোতে বিলম্বের মূল কারণ হলো মাউশির অর্থ ও ক্রয় শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক আবু সাঈদ মজুমদারের অসুস্থতা। তিনি আজ মঙ্গলবার অফিসে উপস্থিত হতে পারেননি, ফলে সরকারি হিসাব দপ্তরে (চিফ অ্যাকাউন্টস অফিস) বেতন-ভাতার সার্বিক তথ্য প্রেরণ সম্ভব হয়নি। সাধারণত মাসিক এমপিও বেতন পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ইএমআইএস সেল থেকে প্রয়োজনীয় হিসাব প্রস্তুত হয় এবং তা যাচাই করে অর্থ ও ক্রয় শাখা চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসের কাছে পাঠায়। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কারণে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়নি।
ইএমআইএস সূত্র আরও জানায়, কর্মকর্তার অসুস্থতার কারণে যে বিলম্ব তৈরি হয়েছে তা খুব দীর্ঘায়িত হবে না। আজ রাতেই যদি সংশ্লিষ্ট স্বাক্ষর ও যাচাই-পার্বতী কাজ সম্পন্ন করা যায়, তাহলে বুধবারের মধ্যেই অর্থ ছাড় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। এরপর ইএফটির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে টাকা পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগবে না। ফলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই নভেম্বর মাসের বেতন পেয়ে যাবেন।
এদিকে শিক্ষক-কর্মচারী সমাজে বেতন দেরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা হতাশা দেখা গেলেও মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত টেকনিক্যাল এবং একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতি সাময়িক বিলম্ব সৃষ্টি করলেও তা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাউশির অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রেরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বয়ংক্রিয় ও নির্ভরযোগ্য করতে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত কর্মকর্তা বা বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যবস্থা রাখার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষকদের বেতন দ্রুত ছাড় করতে উপপরিচালকের সাথে যোগাযোগ করেছেন ইএমআইএস সেলের কর্মকর্তারা। সেলের একটি দল উপপরিচালকের বাসা নারায়নগঞ্জে যাবেন। সেখান থেকেই শিক্ষকদের নভেম্বরের বেতন-ভাতার তথ্য পাঠানো হবে।
মাউশির নাম প্রকাশে অনিচ্ছূক দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন জানান এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীগণের মধ্যে নভেম্বর মাসের বেতন ভাতাদির টাকা আগামী বুধবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাবেন আশা করা যায়। এবং তিনি এটাও বলেন হয়তবা আগামী বুধবার বেতনের টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
এছাড়া নির্দেশনায় আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যদি কোনো শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওর টাকা ভুল তথ্যের কারণে ইএফটিতে পাঠানো না যায়, তার পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপর বর্তাবে। অর্থাৎ তথ্যগত ত্রুটি বা বিল দাখিলে অবহেলা প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক সেবা বিলম্বের কারণ হলে মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকবে।
সব মিলিয়ে, নভেম্বর মাসের এমপিও-বেতন অনুমোদনের এই প্রক্রিয়া বেসরকারি শিক্ষা খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত করেছে। ভবিষ্যতে ইএমআইএস সেলের মাধ্যমে তথ্য হালনাগাদ, বিল দাখিল এবং ইএফটি চালান প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
Leave a Reply