বেসরকারি স্কুল ও কলেজে জনবল নিয়োগ এবং এমপিও নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের বিভিন্ন অসঙ্গতি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা, পদোন্নতি, সমন্বয় এবং যোগ্যতা মানদণ্ড নিয়ে অভিযোগ থাকায় সরকার নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে ৫৮ পাতার সংশোধিত নীতিমালার খসড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সচিব আজ রবিবারই স্বাক্ষর করলে সংশোধিত নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। যদি কোনো কারণে স্বাক্ষর বিলম্ব হয়, তবে জারি প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যস্ততা ও দাপ্তরিক কাজের কারণে এতদিন খসড়ায় স্বাক্ষর হয়নি। তবে আজকের মধ্যে স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সংশোধিত নীতিমালা আজই ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রস্তুতি আছে, কেবল সচিবের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের হাতে আসা নীতিমালার ৯ থেকে ১১.৪ ধারা পর্যন্ত অংশে উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন দেখা গেছে। এগুলো মূলত নিয়োগ, সমন্বয়, কোটা, বাধ্যতামূলক বিষয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পদোন্নতি কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
অনেক কলেজে স্নাতক (পাস) কোর্সে এমপিও নেই, কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের উচ্চমাধ্যমিক শাখায় এমপিও আছে—এ সমস্যার সমাধানে সরকার নতুন নিয়ম যুক্ত করেছে।
✔ স্নাতক (পাস) স্তরে এমপিওবিহীন হলেও উচ্চমাধ্যমিক শাখায় কোনো প্রভাষকের পদ শূন্য থাকলে—
সেই প্রতিষ্ঠানে ২০১৬ সালের পূর্বের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক প্যাটার্নভুক্ত পদে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রভাষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হতে পারবেন।
✔ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও যোগ্যতা থাকলে শূন্য পদের বিপরীতে সমন্বয় হতে পারবেন।
✔ নিরাপত্তাকর্মী, নৈশপ্রহরী, আয়া, অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ক্ষেত্রে এসএসসি/দাখিল/সমমান পাশ আবশ্যক।
আগে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষক-কর্মচারীরা অনিশ্চয়তায় পড়তেন। এবার সেই সংকটের সমাধান—
✔ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অফিস আদেশ দিয়ে কাছাকাছি সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে তাদের সমন্বয় করবে।
এতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমবে।
✔ পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওড়, বস্তি বা অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া এলাকায় বিশেষ কোটার বিষয়ে সরকার সময় সময় পরিপত্র জারি করতে পারবে।
এটি ওইসব অঞ্চলে শিক্ষক সংকট দূর করতে সাহায্য করবে।
✔ সরকার যদি কোনো নতুন বিষয়কে আবশ্যিক ঘোষণা করে, তবে সেই বিষয়টি প্যাটার্নভুক্ত পদে যুক্ত হবে।
✔ সেই বিষয়ে বিধি মোতাবেক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক এমপিওভুক্ত হবেন।
✔ শিক্ষক ও প্রদর্শক পদে নিয়োগ পেতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এনটিআরসিএ রেজিস্ট্রেশন ও সুপারিশ থাকতে হবে।
✔ নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিশিষ্ট ‘ঘ’—তে উল্লেখিত শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার যোগ্যতা অনুসরণ করতে হবে।
✔ এনটিআরসিএ শুরুর পূর্বে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারা আগের চাকরিবিধি অনুযায়ী যোগ্যতা পূরণ করলেই বৈধ ধরা হবে।
✔ প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষের ক্ষেত্রে নীতিমালা জারির পূর্বে কেউ যদি অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থাকে—
তবে তারা সাময়িকভাবে এক ধাপ নিচের বেতনে চললেও
অভিজ্ঞতা পূর্ণ হলেই মূল স্কেলে উন্নীত হবেন।
✔ নীতিমালা জারির পরে অবশ্যই নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে আর নিয়োগ দেয়া যাবে না।
✔ নিম্ন-মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের যোগদানের ৫ বছরের মধ্যে বিএড/বিএমএড বা সমমানের শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করতে হবে।
✔ ডিগ্রি অর্জনের পর তারা জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড-১০ পাবেন—
তবে এটি উচ্চতর স্কেল হিসেবে ধরা হবে না (অর্থাৎ প্রমোশনের গ্রেড গণনায় প্রভাব ফেলবে না)।
✔ যারা পূর্বে শিক্ষায় ডিগ্রিবিহীন অবস্থায় এমপিও পেয়েছেন, তারাও নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে এই ডিগ্রি করতে পারবেন।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—
✔ শিক্ষা জীবনের যেকোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ থাকলে প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ পদে আবেদনই করা যাবে না।
আগের নীতিমালায় এই বাধা ছিল না।
এটি সংশোধিত নীতিমালার সবচেয়ে আলোচিত অংশ।
✔ এমপিওভুক্ত প্রভাষকরা ৮ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূরণের পর
বিভিন্ন সূচকে মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হতে পারবেন।
✔ প্যাটার্নভুক্ত প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের মোট পদের ৫০% এর মধ্যেই পদোন্নতি দেওয়া হবে।
✔ ভগ্নাংশ গণনায় ০.৫ বা তার বেশি হলে পরবর্তী পূর্ণ সংখ্যা গণনা করে পদোন্নতি হবে।
✔ মোট পদ সংখ্যা বাড়বে না; অর্থাৎ সীমিত পদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা থাকবে।
✔ যারা মূল্যায়নভিত্তিক দ্রুত পদোন্নতি পাবেন না, তারা—
— ১০ বছর পর গ্রেড–৯ থেকে গ্রেড–৮
— ধারাবাহিক ১৬ বছর পর সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হবেন।
✔ সহকারী অধ্যাপক পদের গ্রেড হবে — গ্রেড–৬।
সংশোধিত এমপিও নীতিমালা মূলত—
এসব লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এমপিও ব্যবস্থা নানা অনিয়মে জর্জরিত ছিল। নতুন নীতিমালা এই বিশৃঙ্খলা কমানোর পাশাপাশি শিক্ষক সমাজকে একটি নির্দিষ্ট ক্যারিয়ার পথও দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Leave a Reply