চলতি বছরের মতোই আগামী বছরেও পাঠ্যবই বিতরণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর দুই মাসও বাকি নেই, কিন্তু এখনো মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই মুদ্রণ কার্যক্রম আশানুরূপ অগ্রগতি পায়নি। বছরের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে অন্তত অর্ধেক বই ছাপানো শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে নভেম্বরের শুরুতে এসে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ১ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে। ফলে নতুন বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার যে জাতীয় ঐতিহ্যগত প্রতিশ্রুতি—তা এবার বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য মোট ২১ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কপি বই ছাপানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নবম শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ২৮ কপি, যা ২৩৪টি লটে ভাগ করে বিভিন্ন ছাপাখানায় মুদ্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কাজ শুরুর পর ৭০ দিনের মধ্যে সব বই ছাপানো ও বাঁধানো শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১ কোটি ৫১ লাখ ৭৪ হাজার ফর্মা ছাপা শেষ হয়েছে এবং বাঁধাই সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার কপি বই, যা মোট কাজের ১ শতাংশের সামান্য বেশি।
বর্তমানে ২২১টি লটে ছাপার কাজ কোনোভাবে চলছে, কিন্তু ১৩টি লট সম্পূর্ণ নন-রেসপনসিভ—অর্থাৎ, সেই ছাপাখানাগুলো নির্ধারিত সময়েও কাজ শুরু করেনি বা চুক্তি সম্পন্ন করেনি। এসব লটের জন্য আবারও পুনঃদরপত্র (re-tender) আহ্বান করতে হচ্ছে। ফলে পুরো মুদ্রণ প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে মঙ্গলবার এনসিটিবি ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, ছাপাখানার মালিকদের আনাগোনা বাড়ছে। অনেকে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত, আবার অনেকেই শর্তের জটিলতা ও দরপত্রের দীর্ঘসূত্রতার কারণে দ্বিধায় রয়েছেন। প্রেস মালিকদের অভিযোগ, এ বছর এনসিটিবি একাধিকবার দরপত্র বাতিল করেছে, আবার নতুন করে শর্ত যোগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কাগজ সরবরাহের মান, সময়সীমা, মূল্যছাড়, পরিবহন খরচ, এমনকি অর্থপ্রদানের বিলম্ব—যা নিয়ে তাদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
একজন প্রেস মালিক বলেন, “এ বছর পুনঃদরপত্র আর প্রশাসনিক জটিলতায় ছাপার কাজ অন্তত এক মাস পিছিয়ে গেছে। ডিসেম্বরের আগে আমরা চুক্তি শেষ করতে পারব না। তার ওপর বই বাঁধাই, ট্রান্সপোর্ট ও বিতরণে আরও ৪০ থেকে ৫০ দিন লাগবে। এই হিসেবে মার্চের আগে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো খুব কঠিন।”
এনসিটিবি জানিয়েছে, নবম শ্রেণির বইয়ের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) জারি হয়েছে ২৭ অক্টোবর। চুক্তি করার জন্য ছাপাখানাগুলোকে দেওয়া হয় ২৮ দিন সময়, যা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে। এরপর ৫০ দিন ছাপার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কাজ শুরু হলেও জানুয়ারি মাসজুড়ে ছাপা চলবে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি নাগাদ বই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গেলে বাস্তবে সময় আর হাতে থাকে না।
অন্যদিকে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের মুদ্রণ কার্যক্রম এখনো শুরুই হয়নি। প্রাথমিক পর্যায়ের বইয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও মাধ্যমিক পর্যায়ের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাপার কাজ শেষ হওয়ার পর বই বাঁধাই, প্যাকেটজাত, ট্রাকে তোলা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো এবং বিদ্যালয়ে বিতরণ—পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। কাজের বর্তমান গতি বিবেচনায় এই সময়সীমা মেনে চলা প্রায় অসম্ভব। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা আগামী বছরের মার্চ মাসের আগে বই হাতে পাবে না।
এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রাথমিক শিক্ষার বই ছাপায় কিছুটা আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি রয়েছে, কারণ সেই পর্যায়ের দরপত্র আগে সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলক কম। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে বইয়ের সংখ্যা বেশি, বিষয়বস্তু জটিল এবং লটভিত্তিক কার্যক্রম ধীরগতির হওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে।
এভাবে চলতে থাকলে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার সরকারি লক্ষ্য ব্যর্থ হতে পারে। একদিকে প্রশাসনিক বিলম্ব, অন্যদিকে ছাপাখানার সীমিত সক্ষমতা ও জটিল শর্ত—সব মিলিয়ে এনসিটিবি আবারও বই বিতরণে সংকটে পড়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো না হয়, তবে আগামী শিক্ষাবর্ষেও শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতে খালি হাতে স্কুলে যেতে বাধ্য হবে—যা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় অস্বস্তিকর বার্তা হয়ে থাকবে।
Leave a Reply