চিকিৎসা শিক্ষায় বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষক সংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের পাঁচটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদের মূল বেতনের ৭০ শতাংশ হারে প্রণোদনা ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) এ সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। দুটি প্রজ্ঞাপনেই স্বাক্ষর করেছেন বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সঞ্জীব দাশ।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ছাড়াও রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের শিক্ষকরা মূল বেতনের ৭০ শতাংশ হারে মাসিক প্রণোদনা ভাতা পাবেন। একই সঙ্গে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ, একটি সরকারি ডেন্টাল কলেজ (ঢাকা ডেন্টাল কলেজ), সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন (সিএমই) এবং ১৯টি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ১০টি বিষয়ে পাঠদানরত শিক্ষকরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
এই ১০টি বিষয়ের মধ্যে ৮টি বেসিক সাবজেক্ট হলো— অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মাকোলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন, প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি। এ ছাড়া ভাইরোলজি ও এনেস্থেসিওলজি বিষয়দুটি বেসিক সাবজেক্ট না হলেও নন-প্র্যাকটিসিং হওয়ায় তাদেরও প্রণোদনা দেওয়া হবে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, চিকিৎসা শিক্ষায় বেসিক সাবজেক্টে শিক্ষক সংকট দূরীকরণের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রণোদনা ভাতা শুধুমাত্র নন-প্র্যাকটিসিং (অচিকিৎসকতামূলক) শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এজন্য প্রত্যেক শিক্ষককে দাপ্তরিকভাবে ‘নন-প্র্যাকটিসিং ডিক্লারেশন’ জমা দিতে হবে। কোনো শিক্ষক যদি চিকিৎসা প্র্যাকটিসে যুক্ত থাকেন বা তা প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি এ ভাতার জন্য বিবেচিত হবেন না।
এই আর্থিক সুবিধা চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর থেকে কার্যকর হবে। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, এ ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে সব আর্থিক বিধি-বিধান কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এটি ৯ম জাতীয় বেতন স্কেলে অপরিবর্তনীয় থাকবে এবং ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ভার সংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধকারী কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে।
সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বেসিক সাবজেক্টে শিক্ষক সংকট প্রকট। কারণ এসব বিষয়ে অধ্যয়নরত চিকিৎসকরা সাধারণ চিকিৎসা প্র্যাকটিস করতে পারেন না, ফলে তাদের আয় সীমিত থাকে। শিক্ষকতার বাইরে বিকল্প পেশাগত সুযোগ না থাকায় চিকিৎসকরা এসব বিষয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে বেসিক সাবজেক্টে মোট ২,১৫৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১,৬২৪ জন, অর্থাৎ ৫৩১টি পদ (২৫ শতাংশ) শূন্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল থেকে সরকার বেসিক ৮টি বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় গ্রেডভিত্তিক প্রণোদনা দিয়ে আসছে। তখন নবম গ্রেডে ১০ হাজার, অষ্টমে ১১ হাজার, সপ্তমে ১৩ হাজার, ষষ্ঠে ১৫ হাজার, পঞ্চমে ১৬ হাজার, চতুর্থে ১৮ হাজার এবং তৃতীয় গ্রেডের শিক্ষকদের ২০ হাজার টাকা করে মাসিক প্রণোদনা দেওয়া হতো। পরে অ্যানেস্থেসিওলজি ও ভাইরোলজি বিষয়ের শিক্ষকদেরও এই ভাতার আওতায় আনা হয়।
তবে চলতি বছরের শুরুতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর প্রস্তাব দিয়েছিল বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদের মূল বেতনের শতভাগ হারে প্রণোদনা দেওয়ার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে তা আটকে যায়। পরে জুলাই মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় ৫০ শতাংশ হারে প্রণোদনার অনুমতি দেয়, কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পুনঃসুপারিশে অবশেষে ৭০ শতাংশ হারে প্রণোদনা অনুমোদন করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে চিকিৎসা শিক্ষায় বেসিক সাবজেক্টের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
Leave a Reply