এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর যেসব শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান না করে ব্যক্তিগত কিংবা বাহিরের কাজে সময় ব্যয় করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “শিক্ষকদের প্রতি সরকারের আর্থিক দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি শিক্ষকদেরও রাষ্ট্র ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।” সোমবার (২৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আবরার বলেন, “দেখা যাচ্ছে, এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষকই নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। কেউ প্রশাসনিক কাজে, কেউ ব্যক্তিগত ব্যবসা বা কোচিংয়ে যুক্ত আছেন। অথচ তাদের সরকারি অর্থে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষে এমন অপচয় আর সহনীয় নয়। এখন থেকে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, উপস্থিতির রেকর্ডে অনিয়ম করা বা দায়িত্ব অবহেলা করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, “শিক্ষা আইনের মধ্যেই শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অতীতে সেই আইনি কাঠামো বাস্তবায়নে গাফিলতি ছিল। এবার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আইনের আওতায় থেকেই প্রতিটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। শুধু নিয়ম নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।”
অধ্যাপক আবরার বলেন, “সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের শৃঙ্খলার ঘাটতি বা দায়িত্বহীনতা দেখা যায়, তার মূল কারণ হচ্ছে দায়বদ্ধতার অভাব। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি যেহেতু স্কুল, তাই স্কুল পর্যায় থেকেই প্রশাসনিক ও নৈতিক জবাবদিহিতা জোরদার করা হলে সামগ্রিক সরকারি ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আমরা এখন সেই দিকেই এগোচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্য বা ১০ শতাংশের নিচে পাসের হার দেখা গেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের কারণ খতিয়ে দেখার জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হচ্ছে। “শুধু খারাপ ফলের প্রতিষ্ঠান নয়,” তিনি বলেন, “যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে—যেখানে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার স্থিতিশীল—সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরও ডেকে আলোচনা করা হবে। তাদের সাফল্যের মডেলটি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।”
অধ্যাপক আবরার মনে করেন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ালে ফলাফল উন্নত করা সম্ভব—এ বিষয়ে সরকারের হাতে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এমপিওভুক্ত হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠান নানা সংকটে জর্জরিত—কখনও শিক্ষক সংকট, কখনও শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি বা অনিয়মিত ক্লাস। এসব ‘নন-পারফর্মিং’ প্রতিষ্ঠান চালু রাখার পরিবর্তে মার্জ বা একীভূত করার বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে। এতে আর্থিক অপচয় রোধের পাশাপাশি শিক্ষা মানও উন্নত হবে।”
তিনি আরও উদাহরণ দিয়ে বলেন, “কিছু বিদ্যালয়ে একশ থেকে দেড়শ শিক্ষার্থী ভর্তি থাকলেও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মাত্র ১০-১২ জন। অথচ ওই প্রতিষ্ঠানে ১৫-২০ জন শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন—এটি চরম রাষ্ট্রীয় অপচয়। সরকার এই ধরনের অকার্যকর ব্যয় বন্ধে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও ফলাফলের হার—এই তিনটি সূচকের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এমপিও স্থায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।”
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে অধ্যাপক আবরার জোর দিয়ে বলেন, “শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। যারা সরকারের অর্থে বেতন নিচ্ছেন কিন্তু শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা দিচ্ছেন না, তারা প্রকৃত অর্থে জাতির ক্ষতি করছেন। এবার সেই দায় কেউ এড়াতে পারবে না। শিক্ষা খাতকে জবাবদিহিমূলক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ করে তুলতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর।”
Leave a Reply