বেসরকারি স্কুল ও কলেজগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষ্য নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালা তৈরি করেছে সরকার। এ নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকারের এই উদ্যোগে শিক্ষক-কর্মচারী, সচেতন নাগরিক ও অভিভাবক— সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে নতুন নীতিমালাকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে একটি পক্ষ আদালতে রিট দায়ের করলে আদালত ওই পরিপত্রের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। আদালতের এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন আগে থেকেই সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ অনুযায়ী কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের রাখার প্রস্তাব ছিল। সরকারের প্রণীত নীতিমালা মূলত সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের অংশ। সূত্রটির দাবি, এই নীতিমালা বাস্তবায়ন ঠেকাতে এখন বিভিন্ন মহল থেকে অপচেষ্টা চলছে। তাই আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যেভাবে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালা করেছি, তাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই সন্তুষ্ট হয়েছেন। তারা আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আদালতের রিটের বিষয়টি আমরা আদালতের মাধ্যমেই মোকাবিলা করব। ইতিমধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই আপিল করা হবে।”
আপিলে মন্ত্রণালয় কী বলবে— জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আমরা আদালতকে জানাব, এটি কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়; জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের আনুষ্ঠানিক সুপারিশের ভিত্তিতেই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আদালতকে আমরা বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরব, এরপর আদালত যা সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটির জন্য আমরা অপেক্ষা করব।”
এর আগে আইনজীবী ফখরুল ইসলাম ম্যানেজিং কমিটি গঠন ও অ্যাডহক কমিটি বিলুপ্তির সময়সীমা সংক্রান্ত পরিপত্র স্থগিত চেয়ে রিট দায়ের করেন। তিনি জানান, নয়টি শিক্ষা বোর্ড ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনার প্রবিধানমালায় সংশোধন আনে, যাতে বলা হয়— সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নবম গ্রেডের নিচে নন এমন কর্মকর্তা বা অবসরপ্রাপ্ত হলে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা কমিটির সভাপতি হতে পারবেন। অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আর কোনো সাধারণ নাগরিক হতে পারবেন না; যা বৈষম্যমূলক বলে দাবি করা হয়। আগে সভাপতি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হতেন।
ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, সংশোধিত প্রবিধানমালার ১৩(১) এবং ৬৪(৩) বিধিকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না— তা জানতে চেয়ে আদালত রুল জারি করেছেন। একইসঙ্গে অ্যাডহক কমিটি বিলুপ্তির বিষয়ে ৮ সেপ্টেম্বরের পরিপত্রের কার্যক্রমও আদালত স্থগিত করেছেন। ফলে আপাতত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলোর অ্যাডহক কমিটিগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, “আমরা আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে জবাব দেব। রিটের প্রেক্ষিতে আদালত যে রুল জারি করেছেন, সেটি স্থগিত করার জন্য আমরা আইনগতভাবে পদক্ষেপ নেব। আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।”
এইভাবে আদালত ও সরকারের মধ্যে একটি আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে— ভবিষ্যতে বেসরকারি স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, এবং সেখানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না।
Leave a Reply