সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল আলোচিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবায়ন কমিটির কাজ শেষ হলে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললেই শুরু হবে প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারের কাজ এগিয়ে চলছে এবং এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিবেদন অর্থ বিভাগে জমা দিয়েছে। বর্তমানে অর্থ বিভাগ সুপারিশের আর্থিক প্রভাব, বাস্তবায়নের ধাপ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছে। এরপরই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হলেও অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নবম বেতন কাঠামোর সঙ্গে আইএমএফের ঋণের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং এটি নিয়ে কাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে তিনি বলেন, বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে মন্তব্য করতে চান না।
অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, আইএমএফ নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কোনো আপত্তি জানায়নি এবং এ বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত দেওয়ারও এখতিয়ার নেই। তবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তাই এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।
নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী—
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বাস্তবায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত বরাদ্দের একটি বড় অংশ সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইএমএফ নয়, বরং পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। কারণ এটি এককালীন ব্যয় নয়; ভবিষ্যতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও একই বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। ফলে সরকারের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করবে।
তাদের মতে, বাজেটে বরাদ্দ রাখাই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ বাস্তবে সংগ্রহ করতে হলে কর আদায় বৃদ্ধি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বর্তমানে নবম পে স্কেলের সুপারিশ অর্থ বিভাগে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এই বিশ্লেষণ শেষ হলে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি এবং বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। ফলে সরকারি চাকরিজীবী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের দৃষ্টি এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
Leave a Reply