মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চলতি বছরের জুলাই মাসের বেতন-ভাতার বিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে পারেনি ১১৮টি প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জুলাই মাসের বিল প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আশার খবর হলো, আগামী আগস্ট মাসের বিল জমা দেওয়ার সময় জুলাই মাসের বিলও একসঙ্গে দাখিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
মাউশি সূত্রে জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জুলাই মাসের বিল ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) ব্যবস্থায় জমা দিতে পারেনি, তারা আগস্ট মাসে নিয়মিত বিলের সঙ্গে আগের মাসের বিলও জমা দিতে পারবে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা অর্থ একসঙ্গেই নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ইএফটি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও কেন প্রতি মাসেই কিছু প্রতিষ্ঠান বিল জমা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?
একসময় এমপিও বিল ব্যাংকের মাধ্যমে এনালগ পদ্ধতিতে জমা দিতে হতো। সে সময় প্রতিষ্ঠানের সভাপতির স্বাক্ষর, ব্যাংকে কাগজপত্র জমা, বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদন এবং সমন্বয়হীনতার কারণে বিল প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিত। অনেক ক্ষেত্রে সভাপতির অনুপস্থিতি কিংবা স্বাক্ষরসংক্রান্ত জটিলতায় বিল নির্ধারিত সময়ে জমা দেওয়া সম্ভব হতো না।
এসব সমস্যা দূর করতেই সরকার ধাপে ধাপে ইএফটি ব্যবস্থা চালু করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইনে বিল প্রস্তুত ও দাখিল করছে। ফলে আগের মতো কাগজপত্র বহন, ব্যাংকে দৌড়ঝাঁপ কিংবা সভাপতির সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই কমে গেছে।
ইএফটি ব্যবস্থা চালুর পর ধারণা করা হয়েছিল, বিল দাখিলে আর বড় ধরনের কোনো সমস্যা থাকবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রায় প্রতি মাসেই মাউশি জানায়, কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল সাবমিট করতে পারেনি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, সমস্যার মূল কারণ কোথায়?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত অপারেটরের অসাবধানতা, তথ্য হালনাগাদ না করা, সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্পন্ন না হওয়া, নির্ধারিত সময় সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রবণতার কারণে বিল জমা দিতে বিলম্ব হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগ, কারিগরি ত্রুটি অথবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবও দায়ী হতে পারে। তবে এসব কারণ থাকলেও প্রতি মাসে একই ধরনের ঘটনা ঘটাকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।
একটি প্রতিষ্ঠান সময়মতো বিল জমা না দিলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা। নির্ধারিত সময়ে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আর্থিক পরিকল্পনায় বিঘ্ন ঘটে। অনেকেই ব্যাংক ঋণ, কিস্তি কিংবা অন্যান্য মাসিক ব্যয় সময়মতো পরিশোধ করতে পারেন না।
যদিও আগস্ট মাসে জুলাইয়ের বিল একসঙ্গে জমা দেওয়ার সুযোগ থাকায় আর্থিক ক্ষতি স্থায়ী হবে না, তবুও এক মাস বিলম্বিত হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের দুর্ভোগ এড়ানো যাচ্ছে না।
শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ইএফটি ব্যবস্থা সফলভাবে পরিচালনার জন্য শুধু সফটওয়্যার চালু করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিল জমা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিল দাখিলের শেষ তারিখের আগেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
সরকার শিক্ষা খাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ইএফটি পদ্ধতি চালু করেছে, যাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদান আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত হয়। কিন্তু প্রতি মাসেই যদি কিছু প্রতিষ্ঠান বিল জমা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হবে না।
জুলাই মাসে ১১৮টি প্রতিষ্ঠানের বিল জমা না দেওয়ার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় প্রতি মাসেই কিছু শিক্ষক-কর্মচারীকে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষার মধ্যে থাকতে হবে এবং একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসবে—ইএফটি চালুর পরও কেন বিল দাখিলে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান?
Leave a Reply