চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়সূচি একাধিকবার পরিবর্তিত হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রথমে জুলাই মাসের মাঝামাঝি ফল প্রকাশের কথা জানানো হলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এরপর আবার নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা হলেও সেটিও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
বারবার ফল প্রকাশের তারিখ পরিবর্তনের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা, গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ফল প্রস্তুত থাকার পরও কেন প্রকাশে এত দীর্ঘ সময় লাগছে। অন্যদিকে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ফলাফল নিয়ে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রথমদিকে জানিয়েছিলেন, ২০ জুলাইয়ের মধ্যেই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে ২০ জুলাইয়ের মধ্যেই ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ১১ জুলাই ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানও জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।
কিন্তু ১৮ জুলাই আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড জানায়, তখনও ফলাফল প্রস্তুতের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে পূর্বঘোষিত সময়সূচিতে ফল প্রকাশ সম্ভব হবে না।
পরবর্তীতে জানানো হয়, ২৮ জুলাইয়ের পর যেকোনো দিন ফল প্রকাশ করা হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফল প্রকাশের সময়সূচি বারবার পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—যদি ফল প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষই হয়ে থাকে, তাহলে প্রকাশে অতিরিক্ত প্রায় এক মাস সময় লাগছে কেন?
এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আগের বছরের তুলনায় দুর্বল হতে পারে। সরকারের বর্তমান মেয়াদের প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষায় প্রত্যাশার তুলনায় ফল ভালো না হওয়ায় প্রকাশের আগে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
বোর্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিপাত, বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি এবং একই সময়ে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। সেই চাপের প্রভাব এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত করার কাজেও পড়েছে।
ফলাফল প্রকাশে বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকেই সম্ভাব্য কম পাসের হারকে সামনে আনছেন।
গত কয়েক বছরের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাসের হার ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করেছে।
এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, এবার পাসের হার আগের বছরের তুলনায় আরও কম হতে পারে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা বোর্ড এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সাব-কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“ফলাফল টেম্পারিং বা ঘষামাজার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ বানোয়াট।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা বোর্ডের ফল প্রস্তুত করার পুরো প্রক্রিয়া প্রযুক্তিনির্ভর এবং বহুস্তরীয় যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে ইচ্ছামতো ফল পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরীক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া গেছে।
ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, ঝিনাইদহ, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ২০ জন পরীক্ষক জানিয়েছেন, তারা যে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন, তাতে আগের বছরের তুলনায় ফেলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তাদের মতে, বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়ে ফল আশানুরূপ নয়।
শুধু কঠিন বিষয়ই নয়, ইসলাম শিক্ষা ও জীববিজ্ঞানসহ তুলনামূলক সহজ হিসেবে পরিচিত বিষয়েও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থী ফেল করেছেন।
পরীক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় কোনো ধরনের নম্বর বাড়িয়ে দেননি। পরীক্ষার্থীরা যে নম্বর পাওয়ার যোগ্য, কেবল সেটিই দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঝিনাইদহের একজন গণিত পরীক্ষক জানান,
তিনি ২২৫টি সাধারণ গণিতের খাতা মূল্যায়ন করেছেন। এর মধ্যে ৪৩ জন ফেল করেছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার মতো উত্তরপত্র ছিল প্রায় ৪০টি।
একই পরীক্ষক কারিগরি বিভাগের ৩৫০টি গণিতের খাতা মূল্যায়ন করেন। সেখানে ২৯০ জন পরীক্ষার্থী ফেল করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
রসায়নের একজন পরীক্ষক জানান, তিনি ৩০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন। এর মধ্যে ৪৫ জন ফেল করেছে এবং প্রায় ৮০ জন জিপিএ-৫ পাওয়ার মতো নম্বর অর্জন করেছে।
ইসলাম শিক্ষার একজন পরীক্ষক বলেন,
তিনি ৩০০টি খাতা মূল্যায়ন করে ৩৫ জন পরীক্ষার্থীকে ফেল পেয়েছেন। তার মতে, ইসলাম শিক্ষার মতো বিষয়ে যদি এমন ফল হয়, তাহলে অন্যান্য কঠিন বিষয়ে ফল আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাজীপুরের একজন প্রধান পরীক্ষক দাবি করেন, তিনি প্রায় ৬ হাজার উত্তরপত্র পর্যালোচনা করেছেন।
তার ভাষায়,
“আমি ৬ হাজার খাতা দেখেছি। এর মধ্যে অর্ধেকই ফেল। ফেলের ক্ষেত্রে গত ১০ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে।”
তবে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
পরীক্ষকদের এমন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সভাপতি প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন,
“কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি ফেল হবে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে বেশি পাস হবে। আপনি যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা এমন হতে পারে। কিন্তু অন্য পরীক্ষকদের ক্ষেত্রে পাসের হার আরও বেশি হতে পারে। তাই মাত্র ২০ জন শিক্ষকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের সামগ্রিক ফলাফল সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।”
তার মতে, দেশের লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর ফলাফল একটি কেন্দ্র বা কয়েকজন পরীক্ষকের অভিজ্ঞতা দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সব বোর্ডের সব বিষয়ের ফল একত্রিত হওয়ার পরই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
এদিকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন ধরেই নানা ধরনের পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে।
কোথাও দাবি করা হচ্ছে, এবার এসএসসির ফল অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় প্রকাশে দেরি হচ্ছে।
আবার কোথাও বলা হচ্ছে, পাসের হার বাড়ানোর জন্য ফলাফল পুনর্বিবেচনা বা পরিবর্তনের কাজ চলছে।
এসব দাবির বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে বলেন,
“ফেসবুকে ছড়ানো এসব খবরের কোনো সত্যতা নেই। ফলাফল পরিবর্তন বা টেম্পারিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের অপেক্ষা করার আহ্বান জানাই।”
ফলে শিক্ষা বোর্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, ফল প্রকাশে বিলম্বের সঙ্গে ফল পরিবর্তন বা পাসের হার বাড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পরই বোঝা যাবে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জনের চিত্র আগের বছরের তুলনায় কতটা পরিবর্তিত হয়েছে।
প্রয়োজনে এটি আরও সংবাদপত্র-ধাঁচের, SEO-অপ্টিমাইজড বা ইউটিউব স্ক্রিপ্ট উপযোগী সংস্করণেও রূপান্তর করে দিতে পারি।
Leave a Reply