বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে ১০ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশিত এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন চলাফেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন-কানুন অনুসরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় আইন, কর্মস্থলের নীতিমালা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট, মন্তব্য, ছবি বা ভিডিওকে আইনের আওতায় মূল্যায়ন করা হয়। তাই প্রবাসীদের উচিত দায়িত্বশীলভাবে অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করা, কোনো তথ্য শেয়ারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা এবং অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পাঠানো লিংক, বার্তা কিংবা অনলাইন প্রতারণার ফাঁদ থেকে সতর্ক থাকা।
মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনায় যেসব বিষয় বিশেষভাবে বর্জনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—
১. উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রচারণা থেকে দূরে থাকতে হবে
কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ বা সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে পোস্ট, ছবি, ভিডিও বা প্রচারণামূলক কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা যাবে না। এমনকি এসব বিষয়ে লাইক, কমেন্ট বা অন্য কোনো ধরনের অনলাইন সম্পৃক্ততাও এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ অনেক দেশে এসব কর্মকাণ্ড আইনগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২. আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য করা যাবে না
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, ইরান-ইসরায়েলসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সংবেদনশীল সংঘাত নিয়ে এমন কোনো পোস্ট, মন্তব্য বা তথ্য প্রচার করা যাবে না, যা অবস্থানরত দেশের আইন লঙ্ঘন করে অথবা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের বিষয়ে মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৩. নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কার্যক্রম বা অনলাইন প্রচারণায় সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে
যে দেশে কর্মরত রয়েছেন, সেখানে নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা অনলাইন রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কোনো কার্যক্রমেও অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা স্থানীয় আইনবিরোধী হিসেবে গণ্য হতে পারে।
৪. সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ নিষিদ্ধ
কর্মস্থল, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, সরকারি স্থাপনা, সামরিক এলাকা বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেক দেশে এসব স্থানের ছবি ধারণ আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৫. ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকতে হবে
নিজের কিংবা অন্য কারও পাসপোর্ট, ভিসা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব নম্বর বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি বা সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
৬. ধর্মীয়, জাতিগত বা বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য পরিহার করতে হবে
ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত পরিচয় বা সম্প্রদায় নিয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে—এমন কোনো পোস্ট, মন্তব্য বা অনলাইন বিতর্কে অংশ না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ এ ধরনের কর্মকাণ্ড সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার পাশাপাশি অনেক দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৭. অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া চাকরি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতারণা থেকে দূরে থাকতে হবে
দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, অবৈধ ভিসা সংক্রান্ত প্রস্তাব কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির নামে পরিচালিত অনৈতিক বা প্রতারণামূলক কার্যক্রমে জড়িত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রস্তাব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য ভালোভাবে যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৮. অপরাধ বা সহিংসতাকে সমর্থন করে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে না
কোনো অপরাধ, সহিংসতা, নাশকতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন, প্রশংসা বা উৎসাহিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ অনলাইনে দেওয়া মন্তব্যও অনেক ক্ষেত্রে আইনি তদন্তের অংশ হতে পারে।
৯. যাচাই ছাড়া অনুদান বা অর্থ সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে
অপরিচিত ব্যক্তি, সংগঠন বা অনলাইন তহবিলে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা অনুদান প্রদান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় মানবিক সহায়তার নামে প্রতারণা কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাই এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
১০. গুজব, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো যাবে না
যেকোনো ধরনের গুজব, ভুয়া সংবাদ, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কোনো তথ্য প্রচারের আগে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তার সত্যতা যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব নির্দেশনা মূলত বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো এবং তাদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, বিদেশে অবস্থানরত প্রতিটি বাংলাদেশির আচরণ ও কর্মকাণ্ড দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আইন মেনে চলা, দায়িত্বশীলভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজস্ব নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
Leave a Reply