সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও প্রশাসনিক কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললেই নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
বুধবার (২৯ জুলাই) অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে সরকারের কাজ নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করে যথাসময়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারি করতেও বেশি সময় লাগবে না।
সরকার গত ২১ এপ্রিল নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ এবং বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয় পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিটি বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে তাদের সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত করেছে।
এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। সফরকালে তারা অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন বেতনকাঠামোর অর্থায়নের উৎস এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে আইএমএফ প্রতিনিধিদল।
বাংলাদেশ বর্তমানে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি কিস্তি পাওয়া গেলেও পরবর্তী ধাপ এগোয়নি। এখন ৪০০ কোটি ডলারের বেশি নতুন ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা আগামী অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় আরও এগোতে পারে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে আইএমএফের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফ নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে কোনো আপত্তি জানায়নি। সংস্থাটি মূলত জানতে চেয়েছে সরকার কীভাবে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থের সংস্থান করবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে।
নতুন পে-স্কেল নিয়ে বারবার মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। তাই সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে চান না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানাবে।
প্রায় এক যুগ পর সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রেডে মোট বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাবও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন বেতনকাঠামো একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। শুরুতে তিন অর্থবছরে বাস্তবায়নের প্রস্তাব থাকলেও পরে দুই অর্থবছরের একটি পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বর্তমানে আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। পরবর্তী অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নবম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা ও অর্থায়নের উৎস নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন সম্পন্ন হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ আরও পরিষ্কার হবে।
Leave a Reply