সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম বেতন কমিশনের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত হলেই তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ে একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই সরকার এটি কার্যকর করার দিকে অগ্রসর হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির কারণে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা তৈরি হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, নতুন পে স্কেলের সঙ্গে আইএমএফের ঋণের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, “কাজ চলছে। বেতনকাঠামো হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারি করতেও বেশি সময় লাগবে না।”
তবে এ বিষয়ে ঘন ঘন মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বেতনকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা ধরনের সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে তিনি একবারেই বিস্তারিত বক্তব্য দিতে চান।
এদিকে অর্থ বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে আইএমএফ সরাসরি কোনো আপত্তি জানায়নি। এমনকি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ারও সংস্থাটির নেই। তবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কীভাবে সংস্থান করা হবে, সে বিষয়ে আইএমএফ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে। একই সঙ্গে তারা রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে, যাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিটির সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এখন তা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। এসব বৈঠকে তারা সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করে। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস সম্পর্কেও জানতে চায়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শুরু হয়। সাত কিস্তিতে এই ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পাঁচ কিস্তি পাওয়ার পর পরবর্তী অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। আগামী অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নতুন পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে রাজস্ব আদায়ের বর্তমান অবস্থা, সরকারি ব্যয়ের চাপ, প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
সেই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারের সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব, দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখার নির্দেশনা দেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই আলোচনায় অনুন্নয়ন খাতের স্থায়ী ব্যয়, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের অবস্থান পর্যালোচনা করা হবে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নতুন পে স্কেলের কাজ চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর অনুমোদন মিললে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করে তা বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
Leave a Reply