স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মো. সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলেরও দাবি জানিয়েছে দলটি।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে আপত্তি, উদ্বেগ এবং কিছু প্রস্তাব তুলে ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং নির্বাচন ব্যবস্থায় জনআস্থা বজায় রাখার বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চিঠিতে জামায়াতে ইসলামী উল্লেখ করে, দেশের সংবিধান এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কমিশনের নিরপেক্ষ অবস্থান, জনগণের আস্থা এবং সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দলটির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে একটি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে দেশের ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।
জামায়াতের মতে, এমন বিধান দেশের সংবিধানে বর্ণিত সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনতার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, প্রস্তাবিত বিধান তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে সংশোধন অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে যোগ্য নাগরিকরা তাদের সাংবিধানিক রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে সম্প্রতি মো. সামসুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করে জামায়াত। দলটির ভাষ্য, এ ধরনের নিয়োগ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি ও নিরপেক্ষতা রক্ষার স্বার্থে তার নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন যে খসড়া আচরণবিধিমালা প্রণয়ন করেছে, তা নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি জানিয়েছে, গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তারা ওই খসড়া আচরণবিধিমালা সম্পর্কে লিখিত মতামত ও কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে। চিঠিতে সেই মতামত ও প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তিনটি নির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছে। প্রথমত, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব আইন ও সংবিধানের আলোকে পুনর্বিবেচনা করে সংশোধন অথবা প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ৬৭ বছর বয়সী মো. সামসুল আলমের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণবিধিমালার খসড়া নিয়ে ৩০ জুন জমা দেওয়া জামায়াতের মতামত ও সুপারিশগুলো বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২১ জুলাই নির্বাচন কমিশনের ১২তম কমিশন সভা শেষে কমিশন জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন না—এমন একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপি, ঋণের জামিনদার এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বা অন্যান্য ইউটিলিটি বিল বকেয়া থাকা ব্যক্তিদেরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ—এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী আইন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য শিগগিরই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
একই কমিশন সভায় নির্বাচন কমিশনার আখতার আহমেদ ভোটার তালিকা হালনাগাদ নিয়েও কমিশনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও তারা ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন না। এ সময় পর্যন্ত তাদের তথ্য কমিশনের ডাটাবেজে ‘ডরম্যান্ট’ অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে এবং বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলেই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় যুক্ত হন।
তিনি আরও জানান, ভোটার তথ্য সংগ্রহের বয়সসীমা আরও কমানো যায় কি না, সে বিষয়টি নির্বাচন কমিশন পর্যালোচনা করছে। ভবিষ্যতে এসএসসি, অষ্টম শ্রেণি কিংবা প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে। প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
Leave a Reply