বাংলা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—‘চোরের নজর বস্তার দিকে।’ অর্থাৎ, যার যে স্বার্থ, তার দৃষ্টি সবসময় সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে। এই প্রবাদের মর্মার্থ কেবল ব্যক্তি জীবনের জন্য নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় প্রযোজ্য হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সেই সভায় কর্মকর্তারা শিক্ষকদের জন্য আরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রশিক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বরং একজন শিক্ষককে যুগোপযোগী রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এ মুহূর্তে বাংলাদেশের শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কি আরও একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প, নাকি তাদের দীর্ঘদিনের মৌলিক সমস্যার সমাধান?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবারও সেই প্রবাদের কথাই মনে পড়ে—‘চোরের নজর বস্তার দিকে’। কারণ, শিক্ষা খাতে যখনই নতুন কোনো প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আলোচনা শুরু হয়, তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য, নাকি আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে?
এখানে পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন, প্রশিক্ষণের বিরোধিতা নয়, বরং প্রশিক্ষণের অগ্রাধিকার এবং কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন।
বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে সময়মতো বেতন, উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা সুবিধা এবং অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে সংগ্রাম করে আসছেন। মাস শেষ হওয়ার পরও অনেক সময় তাদের বেতন বিল ছাড় হতে বিলম্ব হয়। উৎসবের আগে পরিবার নিয়ে আনন্দ করার পরিবর্তে অনেক শিক্ষক অপেক্ষা করেন কবে বেতন ও উৎসব ভাতার টাকা ব্যাংকে পৌঁছাবে।
শিক্ষামন্ত্রী নিজেই একসময় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশের বিশ্বাস, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণেই সেই ঘোষণা বাস্তব রূপ পায়নি। এই ধারণা সঠিক কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন; তবে বাস্তবতা হলো—শিক্ষকরা এখনও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে শিক্ষক তার মৌলিক আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েই অনিশ্চয়তায় থাকেন, তার কাছে নতুন প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর হবে?
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে গত কয়েক দশকে অসংখ্য প্রশিক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা প্রকল্পে।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর কি আমরা কখনও খুঁজেছি?
এই প্রশিক্ষণগুলোর ফলে শিক্ষার গুণগত মান কতটুকু বেড়েছে?
কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষে শ্রেণিকক্ষে নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছেন?
কতগুলো প্রকল্পের স্বাধীন মূল্যায়ন হয়েছে?
কতগুলো প্রকল্পের সুপারিশ পরবর্তী নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা হয়েছে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর খুব কমই পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে অনেক প্রশিক্ষণ প্রকল্পের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রকল্পের পরিকল্পনা হয় রাজধানীর দপ্তরে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। কিন্তু যাদের জন্য প্রকল্প, সেই শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার অংশ হন না।
কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন?
গ্রামের একজন শিক্ষক এবং শহরের একজন শিক্ষকের প্রয়োজন কি একই?
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ও শ্রেণিশিক্ষকের চাহিদা কি এক?
নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে কোথায় সমস্যা?
এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজন নিরূপণ (Needs Assessment) কতটা করা হয়, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষক প্রশিক্ষণে অংশ নিলেও বাস্তব শ্রেণিকক্ষে তার খুব বেশি পরিবর্তন আসে না।
প্রশিক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই প্রশিক্ষণ হতে হবে—
শুধু উপস্থিতির সনদ দিয়ে প্রশিক্ষণের সফলতা মাপা যায় না। সফলতা তখনই, যখন একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নতুন দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীর শেখার মান উন্নত হয়।
বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি ও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে। অর্থাৎ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভিত্তি গড়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
কিন্তু এই খাতের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরেই নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটের কথা বলে আসছেন। অনেক শিক্ষা বিশ্লেষকের মতে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে।
কারণ, একজন উদ্বিগ্ন শিক্ষক কখনও একজন স্বস্তিতে থাকা শিক্ষকের মতো সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতে পারেন না।
বিশ্বের যেসব দেশে শিক্ষার মান সবচেয়ে উন্নত, সেখানে শিক্ষককে শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি; তাকে সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছে।
ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জাপানের অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষককে প্রথমে সম্মান এবং নিরাপত্তা দিতে হয়। তারপর তার দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হয়।
বাংলাদেশেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
আবারও সেই প্রবাদের কাছে ফিরে যাই—‘চোরের নজর বস্তার দিকে।’
যদি শিক্ষা খাতে প্রতিটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নতুন নতুন প্রকল্প, নতুন প্রশিক্ষণ, নতুন ব্যয়—কিন্তু শিক্ষকের মৌলিক অধিকার, আর্থিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা বারবার আড়ালে থেকে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—আমাদের অগ্রাধিকার কি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন, নাকি প্রকল্পকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি?
প্রশিক্ষণ অবশ্যই দরকার। কিন্তু তারও আগে দরকার এমন একজন শিক্ষক, যিনি মাস শেষে নিশ্চিতভাবে বেতন পান, উৎসবে পরিবার নিয়ে হাসতে পারেন, অবসরের পর অনিশ্চয়তায় ভোগেন না এবং রাষ্ট্রের কাছে নিজেকে সম্মানিত মনে করেন।
কারণ, ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে বই তুলে দিলেই যেমন জ্ঞানের বিকাশ হয় না, তেমনি আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকা শিক্ষকের হাতে শত প্রশিক্ষণের সনদ তুলে দিলেও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত সংস্কার শুরু হবে সেদিন, যেদিন শিক্ষককে প্রকল্পের অংশগ্রহণকারী নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
Leave a Reply