সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রত্যাশিত নতুন বেতন কাঠামো বা নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে চলছে চূড়ান্ত পর্যালোচনা। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন (গেজেট) প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকার ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আয়, বাজেটের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে এটি একবারে বাস্তবায়ন না করে পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তবে অর্থনীতির ওপর হঠাৎ বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি না করতে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ীই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। তবে দেশের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এর বাস্তবায়ন হবে পর্যায়ক্রমিকভাবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক চাপের বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর পে-স্কেল নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা তৈরি হলেও অর্থমন্ত্রী বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি সরকারের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং আইএমএফের চলমান কর্মসূচি বা আলোচনার অংশ নয়।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নতুন পে-স্কেলের প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সচিব কমিটির পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।
গেজেট প্রকাশের পর নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে গণনা করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেতন বৃদ্ধির হার, কোন ধাপে কত শতাংশ কার্যকর হবে এবং কোন সময় থেকে কোন সুবিধা পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা, দ্রুত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটানো হবে। অন্যদিকে সরকার চাচ্ছে, অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে।
Leave a Reply