“রক্ষক যদি ভক্ষক হয়” প্রবাদটি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বেশ ভালোভাবে প্রযোজ্য। এখানে “রক্ষক” বলতে সেই সংস্থাগুলিকে বোঝানো হচ্ছে, যারা শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, যেমন মাউশি (MPO) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর “ভক্ষক” হিসেবে তা বোঝায় তাদের যে কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষকদের অধিকার ও দাবি নষ্ট করে ফেলছে। দিনের পর দিন শিক্ষকদের প্রাপ্ত অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করছে।যখনই সরকার কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে আমলারা তার কোন না কোন ভাবে তার বিরোধিতা করে। শিক্ষকদের দাবি কখনই সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করতে দেয় না এদেশের আমলাতন্ত্র।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য এই প্রবাদটির কার্যকারিতা আরও বেশি, কারণ তারা যাদের উপর নির্ভরশীল তাদের পক্ষ থেকেই অযত্ন, অব্যবস্থাপনা এবং অবিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু কেউ কিছু বলছেও না কেউ কিছু করছেও না। দিনের পর দিন এই অযত্ন অবহেলা যেন ক্রমশই বেড়েই চলেছে।
যখনই সরকার কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে আমলারা তার কোন না কোন ভাবে তার বিরোধিতা করে। শিক্ষকদের দাবি কখনই সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করতে দেয় না এদেশের আমলাতন্ত্র।
“শিক্ষকদের প্রতি আমলাদের দৃষ্টিভঙ্গি”
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সমস্যাগুলোর মূল কারণ:
বেতন পরিশোধে বিলম্ব: প্রতিনিয়ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হচ্ছে, যা শিক্ষকদের আর্থিক সংকটে ফেলছে। যদিও সরকারের দায়িত্ব ছিল এটি সঠিক সময়ে পরিশোধ করা, কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষকদের বেতন প্রায়ই আটকে যায়। বেতন সঠিক সময়ে প্রদান করার জন্য সরকার থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে ইএফটির মাধ্যমে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রেরণের কিন্তু সেই উদ্যোগও ভেস্তে যেতে চলেছে কতিপয় কিছু দূর্ণীতি পরায়ন মাউশির কর্মকর্তাদের কারণে।
অনিয়ম ও অব্যবস্থা: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য যে নিয়ম-কানুন থাকা উচিত, তা প্রায়ই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বেতন বা সুবিধা পেতে শিক্ষকদের নানা ধরনের জটিলতা ও অপ্রাসঙ্গিক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে শিক্ষকদের তথ্য যাচাইয়ের নামে দিনের পর দিন শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন আটকে রাখা। দিনের পর দিন শিক্ষক কর্মচারীদের নানাভাবে হয়রানি করা। অনিয়মই যেন মাউশিতে তথা মাউশির কর্মকর্তাদের নিকট নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য ভুল বা সঠিক যাচাই না হওয়া: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তথ্যের ভুল বা সঠিক যাচাই না হওয়ার কারণে তাদের বেতন প্রদানে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও নিয়মিত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান হওয়ার কথা, তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। সঠিক তথ্যকে ভুল বলে আখ্যা দেওয়া। কোন তথ্য ভুল তার সঠিক ব্যাখ্যা না প্রদান করা। শিক্ষকদের দাবির প্রতি অবহেলা: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবির প্রতি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এক ধরনের উদাসীনতা বা অবহেলা যেন আজীবনের সমস্যা এই সমস্যা। নানা আন্দোলন, প্রতিবাদ ও দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষকদের মৌলিক অধিকার এবং বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হচ্ছে না। যখনই সরকার কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে আমলারা তার কোন না কোন ভাবে তার বিরোধিতা করে। শিক্ষকদের দাবি কখনই সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করতে দেয় না এদেশের আমলাতন্ত্র।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য সমস্যার মুখে প্রশাসনিক বা সরকারি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা:
নেতৃত্বের দুর্বলতা: অনেক সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বহীনতার কারণে শিক্ষকদের সমস্যা সমাধান হয় না। কার্যকরী নেতৃত্বের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অন্যায় জটিলতা সৃষ্টি করা: প্রশাসনিক স্তরের অনেক কর্মকর্তার কারণে কর্মক্ষেত্রে এবং ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) ব্যবস্থায় নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষকদের বেতন কখনও কখনও মাসের শেষে পরিশোধ হয় না বা কোনো কারণে পুরোপুরি দেওয়া হয় না। কখনও মাসের পর অহেতুক ভাবে বেতন আটকে রাখা হচ্ছে। উদ্দেশ্য ইএফটি বাস্তবায়ন হতে না দেওয়া।
শিক্ষকদের প্রতি সম্মানহীনতা: এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সমাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয় না। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে, প্রশাসনিক অবহেলা তাদের অবস্থা আরও কঠিন করে তোলে।
সমাধান:
নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং শক্তিশালী আন্দোলন: সকল শিক্ষক বা সকল শিক্ষক সংগঠন যদি একত্রিত হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান এবং তাদের দাবির প্রতি প্রশাসনের গুরুত্ব বাড়াতে পারেন, তাহলে তারা নিজেদের অধিকারের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারবেন।
শিক্ষকদের তথ্য দ্রুত যাচাই: শিক্ষকদের তথ্য শুদ্ধভাবে যাচাই করা এবং ইএফটি সিস্টেমে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতা: প্রশাসনিক স্তরের স্বচ্ছতা এবং শিক্ষকদের বেতন পরিশোধে সঠিক সময় নিশ্চিত করতে হবে।
“রক্ষক যদি ভক্ষক হয়” এই প্রবাদটি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রযোজ্য, কারণ তারা যে প্রশাসনিক সংস্থার উপর নির্ভরশীল, সেই সংস্থা যদি তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে, তবে শিক্ষকরা একেবারে বিপদে পড়ে যান। তবে, একমাত্র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়নই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করতে পারে।
Leave a Reply