ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ইতিহাস একটি জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া, যা বহু রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং আঞ্চলিক বিবাদ এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এখানে সংক্ষেপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ইতিহাসের মূল ঘটনা ও দিকগুলি তুলে ধরা হলো:
ফিলিস্তিনের প্রাচীন ইতিহাস একটি দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময় অধ্যায়, যা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে সভ্যতার জন্ম এবং উন্নতির সাথে সম্পর্কিত। প্রাচীন ফিলিস্তিন অঞ্চলটি আধুনিক ইসরায়েল, পশ্চিম তীর, গাজা, এবং বেশ কিছু অংশে সিরিয়া ও জর্ডান অবস্থিত। এই অঞ্চলের ভূগোল, সংস্কৃতি, ধর্ম, এবং রাজনৈতিক ইতিহাস ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড ছিল ভূমধ্যসাগরের তীরে, যা প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এটি মিশর, মেসোপটেমিয়া, এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সভ্যতাগুলির মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করেছিল। এর অবস্থান বিশেষভাবে সেমিতিক জাতিগুলির (যেমন: ইহুদি, ফিলিস্তিনি, আরব, এবং ফিনিশিয়ান) জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এটি বিভিন্ন শক্তির দ্বারা দখল করা ও শাসিত হয়েছিল।
ফিলিস্তিনের আধিকারিক ইতিহাস ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে শুরু হয়, যখন ব্রিটেন বালফোর ডিক্লারেশন (Balfour Declaration) জারি করে। এতে ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি “জাতীয় ঘর” প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়। এর ফলে ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনে অভিবাসন বৃদ্ধি পায়, যা স্থানীয় আরব জনগণের মধ্যে বিরোধ এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে ব্রিটেন “বালফোর ডিক্লারেশন” জারি করে, যেখানে ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় ঘর প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ১৯২০ সালে লিগ অব নেশনস (জাতি সংঘ) ফিলিস্তিনকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এর ফলে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন বৃদ্ধি পায়, যা স্থানীয় আরব জনগণের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের বিভাজন পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যেখানে একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং একটি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে, ফিলিস্তিনের আরব জনগণ একে প্রত্যাখ্যান করে এবং এই ঘটনা ফিলিস্তিনে ব্যাপক সহিংসতা এবং যুদ্ধের সূচনা করে। এর ফলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হয়ে যায়।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটি দীর্ঘ এবং জটিল ইতিহাসের অংশ, যা ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই সংগ্রামের সূচনা প্রাচীন যুগে হলেও, আধুনিক কালে বিশেষ করে ২০ শতকের প্রথমার্ধে এবং পরবর্তীতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপটে এটি আরও তীব্র এবং ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এখানে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মুহূর্তগুলো এবং ঘটনাগুলি তুলে ধরা হলো।
ফিলিস্তিনে আধুনিক স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা মূলত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটকালে হয়, যখন ১৯১৭ সালে ব্রিটেন বালফোর ডিক্লারেশন জারি করে, যেখানে ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনে একটি “জাতীয় ঘর” প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এতে ফিলিস্তিনের আরব জনগণের মধ্যে ক্ষোভ এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ১৯২০-১৯৩০-এর দশকে ফিলিস্তিনে বেশ কয়েকটি আরব বিদ্রোহ ঘটে, বিশেষ করে ১৯৩৬-১৯৩৯ সালের ফিলিস্তিনের “আল-নাকবা” বা “আরব বিদ্রোহ” একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের আরব জনগণ ইহুদি অভিবাসন এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের বিভাজন পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং একটি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে, ফিলিস্তিনের আরব জনগণ এই পরিকল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে, এটি ফিলিস্তিনের আরব জনগণের জন্য একটি বড় বিপর্যয় ছিল।
১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়, যা ইসরায়েলী বাহিনী এবং আরব দেশগুলির মধ্যে সংঘর্ষে পরিণত হয়। যুদ্ধের ফলে প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হয়ে যায়, এবং তারা তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনার পর থেকেই তাদের “স্বাধীনতা সংগ্রাম” শুরু করে, যা আজও চলমান।
ফিলিস্তিন মুক্তি সংগঠন (PLO) ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনকে ইসরায়েলের দখল থেকে মুক্ত করা এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। PLO এর প্রথম কার্যক্রম ছিল সশস্ত্র সংগ্রাম, এবং তাদের অধিকাংশ গেরিলা দলগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতো।
১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধ (Six-Day War) এর পর, ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা স্ট্রিপ, পূর্ব জেরুজালেমসহ আরো কয়েকটি অঞ্চল দখল করে নেয়, যা ফিলিস্তিনের জন্য একটি নতুন দুঃসহ অধ্যায় শুরু করে। এই যুদ্ধের পর, PLO-এর প্রধান নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং তার সহযোগীরা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সংগ্রাম শুরু করেন।
১৯৭০-৮০-এর দশকগুলিতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম আরও আন্তর্জাতিক আঙ্গিকে উঠে আসে। এই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের বিভিন্ন ফর্ম যেমন সশস্ত্র গেরিলা হামলা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলা, এবং শান্তি আলোচনা চলতে থাকে। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিক-এ ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদদের ওপর হামলা এবং ১৯৭০-এর দশকে প্যালেস্টাইন লিবারেশন আর্মি (PLA) বিভিন্ন দেশেই সহিংস কর্মকাণ্ড চালায়।
এছাড়া, ১৯৭৯ সালের ইরানী ইসলামিক বিপ্লব এবং পরবর্তীতে আরব বিশ্বের মধ্যে ইসলামিক আন্দোলনগুলির বৃদ্ধির সাথে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামেও একটি ধর্মীয় উপাদান যুক্ত হয়। হামাস এবং ইসলামিক জিহাদ-এর মতো গোষ্ঠীগুলি এর পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।ওসলো চুক্তি (১৯৯৩):
১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইসরায়েল এবং প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগঠন (PLO) এর মধ্যে প্রথম সরাসরি শান্তি আলোচনা ছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েল কিছু অঞ্চল ফিলিস্তিনকে স্বশাসন দেওয়ার জন্য রাজি হয় এবং ফিলিস্তিনের জন্য পশ্চিম তীর এবং গাজা স্ট্রিপে সীমিত স্বশাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক, যদিও এই চুক্তি শান্তি স্থাপন করতে ব্যর্থ হয় এবং কিছু মূল সমস্যা, যেমন জেরুজালেমের মর্যাদা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যা, অমীমাংসিত থাকে।
২০০০ সালে ইন্তিফাদা (প্রথম intifada), বা ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হলে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদাও অনেক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং সহিংসতা সৃষ্টি করে। এই সময়েই হামাস গাজা স্ট্রিপে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক এবং সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে উঠে আসে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস ফিলিস্তিনের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গাজা স্ট্রিপের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ২০০৭ সালে ফাতাহ থেকে পশ্চিম তীরে চলে আসে। এই বিভাজন ফিলিস্তিনে একটি বিরোধী রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে, যা আজও অব্যাহত।
বর্তমান পরিস্থিতি:
বর্তমানে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম এখনও চলমান। পশ্চিম তীর এবং গাজা স্ট্রিপের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপন, সেনাবাহিনী, এবং নিরাপত্তা চেকপোস্টের কারণে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজার অবরোধ, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে বাধা, এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৬৭ সালের ৬-দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা স্ট্রিপ এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। এটি ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য একটি বড় বিপর্যয় ছিল, কারণ তারা তাদের ইতিহাসিক ভূমি হারিয়ে ফেলে। ফিলিস্তিনের বেশিরভাগ জনগণ তখন এই অঞ্চলে বসবাস করছিল।
গাজা ও পশ্চিম তীর ফিলিস্তিনের দুটি প্রধান ভূখণ্ড, যেগুলোর ইতিহাস এবং বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। এই দুই অঞ্চল ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য একত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হলেও, তারা আলাদা রাজনৈতিক, ভূখণ্ডগত এবং মানবিক পরিস্থিতিতে রয়েছে। গাজা স্ট্রিপ এবং পশ্চিম তীরের মধ্যে রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত অনেক পার্থক্য থাকলেও, দুটি অঞ্চলই ইসরায়েলি দখল, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং মানবিক সংকট দ্বারা প্রভাবিত।
ভূগোল:
রাজনৈতিক পরিস্থিতি:
মানবিক সংকট:
অর্থনীতি:
ভূগোল:
রাজনৈতিক পরিস্থিতি:
মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা:
অর্থনীতি:
দিক | গাজা স্ট্রিপ | পশ্চিম তীর |
---|---|---|
শাসনকারী গোষ্ঠী | হামাস (ইসলামী রাজনৈতিক গোষ্ঠী) | ফাতাহ (ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ, PA) |
রাজনৈতিক অবস্থা | হামাস ও ফাতাহের মধ্যে বিভাজন | পশ্চিম তীরে ফাতাহের শাসন, ইসরায়েলি দখল |
ইসরায়েলি দখল | ইসরায়েলি অবরোধ, সীমিত শাসন | ব্যাপকভাবে দখল, বসতি স্থাপন |
মানবিক পরিস্থিতি | অভাব, বিদ্যুৎ, পানি সংকট | নিরাপত্তা চেকপোস্ট, চলাচলে বাধা |
অর্থনীতি | অবরুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল | ক্ষতিগ্রস্ত, সীমিত উৎস |
১৯৯৩ সালে, ইসরায়েল এবং PLO এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা “ওসলো চুক্তি” নামে পরিচিত। এই চুক্তির মাধ্যমে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে একে অপরকে স্বীকৃতি দেয় এবং ফিলিস্তিনের কিছু অংশে (পশ্চিম তীর এবং গাজা স্ট্রিপে) ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি ছিল প্রথম বার ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সরাসরি শান্তি আলোচনা এবং কিছু অটোনমি (স্বশাসন) প্রদান করা হয়। তবে, এই চুক্তি পুরোপুরি শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়, কারণ বেশ কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত থাকে, যেমন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমান্ত, শরণার্থী সমস্যা, এবং পূর্ব জেরুজালেমের মর্যাদা।
২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে গাজা স্ট্রিপে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী হামাসের শক্তি বৃদ্ধি পায়। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস ফিলিস্তিনের আইনসভার নির্বাচনে বিজয়ী হয়। এরপর থেকে ফিলিস্তিনের দুই প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠী ফাতাহ (পশ্চিম তীর) এবং হামাস (গাজা) মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সহিংসতার সূত্রপাত ঘটায়।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। পশ্চিম তীর এবং গাজা স্ট্রিপের ওপর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, ইসরায়েলি বসতি স্থাপন, নিরাপত্তা বাধা, এবং রাজনৈতিক বিভাজন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পথে বড় ধরনের অন্তরায়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে ইসরায়েল এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের মূল বিতর্কের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং অনিশ্চিত, যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানবাধিকার সম্পর্কিত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত, ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি ইসরায়েলি দখল, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, আন্তর্জাতিক চাপ, এবং মানবিক সংকট দ্বারা প্রভাবিত। এখানে কিছু প্রধান দিক তুলে ধরা হলো:
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম এখনো ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে ইসরায়েল এই অঞ্চলগুলোতে ব্যাপকভাবে বসতি স্থাপন করেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ বলে বিবেচিত হলেও, ইসরায়েল এই বসতিগুলিকে সমর্থন করছে এবং সেখানে ইসরায়েলি নাগরিকদের বসবাসের জন্য নতুন নতুন বসতি তৈরি করছে। এর ফলে পশ্চিম তীরের ভূমি সংকুচিত হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের চলাফেরা ও জীবনযাত্রা সীমিত হয়ে পড়ছে।
এছাড়া, পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েল “ইসরায়েলের রাজধানী” হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা ফিলিস্তিনিদের জন্য অত্যন্ত বিতর্কিত, কারণ তারা জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করে।
ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত বিভক্ত। ২০০৭ সালে হামাস গাজা স্ট্রিপে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ফিলিস্তিনের প্রধান দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী—ফাতাহ (পশ্চিম তীর) এবং হামাস (গাজা)—এর মধ্যে গভীর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এই বিভাজন ফিলিস্তিনের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছে।
ফাতাহ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (PA) পরিচালনা করছে, যা কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পায়। কিন্তু হামাস গাজা স্ট্রিপে ক্ষমতাসীন, যেখানে তারা নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা চালায়। দুই পক্ষের মধ্যে অনেক সময় রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিরোধ দেখা দেয়, যা ফিলিস্তিনির রাজনৈতিক আন্দোলনকে দুর্বল করে তোলে।
ফিলিস্তিনে বিশেষ করে গাজা স্ট্রিপে মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০০৭ সাল থেকে ইসরায়েল এবং মিশরের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পর, গাজা স্ট্রিপে খাদ্য, পানীয়, বিদ্যুৎ এবং চিকিৎসা সামগ্রীসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে বহু বার যুদ্ধ হয়েছে, যার ফলে গাজা স্ট্রিপে ব্যাপক ধ্বংস সাধন এবং প্রাণহানি ঘটেছে।
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আগ্রাসন এবং বসতিগুলোর সম্প্রসারণের কারণে মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। সেখানে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা চেকপোস্ট এবং বেস্টনির কারণে ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে, তবে ইসরায়েলের কিছু প্রভাবশালী সমর্থক দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাদের নীতি পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি টেকসই শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে এখনও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
ফিলিস্তিনের অনেক অঞ্চল আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছে, তবে এই সমর্থন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং অকার্যকর হয়ে পড়ছে। আরব দেশগুলোও মাঝে মাঝে ফিলিস্তিনের সমর্থনে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তা সীমিত থাকে।
গাজা স্ট্রিপের মানুষ এখনো অতি সংকটপূর্ণ অবস্থায় জীবনযাপন করছে। বহু বছর ধরে ইসরায়েলি বিমান হামলা, ভূমি আক্রমণ, বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা, এবং মানবিক সহায়তার অভাব ফিলিস্তিনিদের জীবনে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গাজায় ইউএনআরডাব্লিউএ (UNRWA) এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলির সহায়তা জরুরি হলেও, নিরাপত্তা চেকপোস্ট ও সীমান্ত বাধার কারণে ওই সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফিলিস্তিনের অর্থনীতি বিশেষভাবে পশ্চিম তীর এবং গাজা স্ট্রিপে দুর্বল। পশ্চিম তীরে অনেক ফিলিস্তিনি কৃষি ও ব্যবসায়িক কাজে নিযুক্ত হলেও, ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা এবং বেসামরিক অবকাঠামো এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলির অভাব ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সীমিত করে রেখেছে। গাজা স্ট্রিপে অবরোধ এবং যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, যেখানে প্রায় ৮০% জনসংখ্যা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত থাকলেও, বাস্তবিক পরিস্থিতি তাতে খুব একটা উন্নতি হয়নি। ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে অ-সম্পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নয়। ফিলিস্তিনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে হলে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির প্রয়োজন, যা এখনও প্রাপ্তি হয়নি।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ইতিহাস রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জনগণের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি, এবং তাদের অধিকার এবং স্বাধীনতা নিয়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ইতিহাস একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, যা রাজনৈতিক সংকট, ধর্মীয় বিরোধ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিপূর্ণ। ফিলিস্তিনের জনগণ স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের জন্য বহু বছর ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তবে এখনও তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
Leave a Reply